কুরবানীর মাসায়েল


কুরবানীর মাসায়েল

কুরবানীর মাসায়েল
কুরবানীর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

কুরবানী শব্দটি আরবী قربان কুরবান হতে উৎপন্ন। যার অর্থ হল, নিকটবর্তী হওয়া বা নৈকট্য লাভ করা। আর শরীয়তের পরিভাষায় কুরবানী বলতে যে পশু ঈদের দিন জবেহ করা হয় তাকেই বুঝানো হয়।
এটাকে আবরীতে أضحية উযহিয়াও বলা হয়। এই أضحية আরবী শব্দটিকে চার ভাবে পড়া যায়।
(১) أضحية (উযহিয়্যাহ)
(২) إضحية (ইযহিয়্যাহ) এ দুটি শব্দের বহুবচন আসে أضاحي)
(৩)  ضحية (যহিয়্যাহ্) বহুবচনেঃ ضحايا যাহায়া
(৪) أضحاه (আযহাহুন) বহু বচনেঃ أضحى এ থেকে কুরবানীর দিন কে আরবী ভাষায় يوم الأضحي (ইয়ামুল আযহা) বলা হয়। (লেসানুল আরাবের বরাতে ফিকহুল উযহিয়্যাহ ৭ পৃঃ)
ইমাম ছানআনী বলেন:
কুরবানীকে আরবী পরিভাষা বলা হয়,  أضاحي আযাহী যা أضحية শব্দের বহুবচন। আর এই শব্দটির হামযায় যের দিয়েও পড়া যায় আবার হামযা বাদ দিয়ে ض এ যবর দিয়ে (ضحية) ও পড়া যায়। (এর শাব্দিক অর্থ অপরাহ্ন) ইহা যেন সে সময়ের নাম থেকেই নেয়া হয়েছে যে সময় উক্ত কুরবানীর পশুকে যবেহ করা বিধেয়। (আর তা হল, অপরা‎হ্নে) (সুবুলু সালামের (৪/১৬০) এর বরাতে ফিকহুল উযহিয়্যাহ্ঃ ৭)

কুরবানীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

কুরবানীর বিধানটি অতীব প্রাচীন বিধান। আল্লাহ বলেন:
﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا﴾
 “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর ব্যবস্থা করেছি।” ( সূরা হাজ্জঃ ৩৪)
আদম (আঃ) এর দুই পুত্র হাবীল ও কাবীলের দেয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের গোড়া পত্তন হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
﴿وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آَدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ  مِنَ الْآَخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ   لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ  إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْمِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ﴾
 “(হে রাসূল!) আপনি তাদেরকে সঠিক ভাবে পড়ে শুনিয়ে দিন আদমের পুত্রদ্বয়ের সংবাদ। যখন তারা কুরবানী দিল কিন্তু তাদের একজনেরটা গৃহীত হল অপরেরটা গৃহীত হল না। তখন (যার কুরবানী গৃহীত হলনা সে যার কুরবান গৃহীত হল তাকে লক্ষ্য করে) বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। (উত্তরে) সে বলল, আল্লাহ তো শুধু পরহেজগারদের থেকেই (কুরবানী) কবুল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত প্রসারিত করলেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য আপন হাত প্রসার করবনা। আমি চাই তুমি আমার গুনাহ এবং তোমার গুনাহ বহন করে জাহান্নামীদের দলভুক্ত হও”। (সূরা মায়েদাহঃ ২৭ ও ২)
তবে আমাদের উপর যেভাবে কুরবানী বিধান রয়েছে তা ইবরাহীম (আঃ) এর কুরবানী থেকে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ﴾
 “আমি তাঁর (ইসমাইল) পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু।” (সূরা সাফফাতঃ ১০৭)

কুরবানী শরীয়ত সম্মত হওয়ার দলীল:

ইবনু কুদামা (রহঃ) আল মুগনী গ্রন্থে (৯/৩৪) বলেন: “ইসলামী শরীয়তে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে কুরবানীর বিধান সাব্যস্ত হয়েছে।”
কুরআন থেকে দলীল: আল্লাহ তায়ালার বাণী:
﴿فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ﴾
 “অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” (সূরা কাওসারঃ ২) 
কোন কোন তাফসীর কারকের মতে এ আয়াত দ্বারা ঈদের নামাযের পর কুরবানী করা উদ্দেশ্য। (ফিককহুল উযহিয়্যাহ) অনুরূপভাবে কুরবানীর সপক্ষে নিন্মোক্ত আয়াতটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآَخِرِينَ﴾
 “আমি এটা (তাঁর আদর্শ) পরবর্তীদের মধ্যে রেখেছি।” (আছ ছাফ্ফাতঃ ১০৮) অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা পশু কুরবানীর বিধানটি ইবরাহীম (আঃ) এর পরবর্তী মানুষের জন্য রেখে দিয়েছেন।
সুন্নাহ (হাদীছ) থেকে দলীল:
 আনাস (রা:) বর্ণনা করেন:
ضحى النبي صلى الله عليه وسلم بكبشين أملحين أقرنين ذبحهما بيده وسمى وكبر ووضع رجله على صفاحها (متفق عليه)
 “নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাদা-কালো রং মিশ্রিত দুটি শিং ওয়ালা ভেড়া কুরবানী কিরে ছিলেন। নিজ হাতে উভয়টিকে যবেহ করে ছিলেন এবং যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম এবং তাকবীর বলেছিলেন তথা বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার বলে যবেহ করেছিলেন। এবং (যবেহ করার সময়)  তিনি ঐ পশুদ্বয়ের কাঁধে পা রেখেছিলেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
ইজমাঃ কুরবানী শরীয়ত সম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমগণ সকলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

কুরবানীর গুরুত্ব ফযীলত এবং তৎ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীছগুলির অবস্থা:

নিঃসন্দেহে কুরবানী একটি ইবাদত এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কারা যায়। এবং তাতে ইবরাহীম (আঃ) এর সুন্নাত আদায় করা হয়। সেই সাথে আমাদের প্রিয় নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নতও প্রতিপালিত হয়। কারণ, এ কুরবানী স্বয়ং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  দিয়েছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  বলেন:

  من كان به سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانا 

অর্থ: “কুরবানী দেয়ার সমর্থ থাকার পরও যে ব্যক্তি কুরবানী দেয় না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে।” (আহমাদ, ইবনু মাজাহ্)

তবে এটিকে অনেক মুহাদ্দিস মাওকুফ বা সাহাবীর উক্তি বলেছেন, অবশ্য মুহাদ্দিস আলবানী হাদীছটিকে মারফু তথা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বানী হিসাবে হাসান বলেছেন। (দ্রঃ ছহীহ ইবনু মাজাহ) 
হাফেজ ইবনু হাজার হাদীছটি সম্পর্কে বলেন, “কুরবানী করার ফযীলতে অনেকগুলি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর একটিও বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হয়নি। বরং তার সবগুলোই যঈফ (দুর্বল) অথবা মউযূ (জাল)। 
মালিকী মাযহাবের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুল আরাবী (রহঃ) বলেন:
ليس في فضل الأضحية حديث صحيح وقد روى الناس فيها عجائب لم تصح منها((إنها مطاياكم إلى الجنة)) (عارضة الأحوذي شرح جامع الترمذي ৬/২৮৮)
কুরবানীর ফযীলতে একটিও ছহীহ হাদীছ নেই। তবে মানুষ এ সম্পর্কে অনেক আজগুবী হাদীছ বর্ণনা করেছে যা মোটেও ছহীহ নয়। সে সব আজগুবী হাদীসের মধ্যে অন্যতম হল এই কথাটি:
(( إنها مطاياكم   إلى الجنة))
 “উহা তোমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন স্বরূপ”। (দ্রঃ তিরমিযীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ আরেযাতুল আহওয়াযী ৬/২৮৮)

নিম্নে কুরবানীর ফযীলত সংক্রান্ত হাদীছগুলি পর্যালোচনা সহ পরিবেশিত হল:

১নং হাদীছঃ
عن عائشة أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ماعمل ابن آدم يوم النحر عملا أحب إلى الله عز وجل من هراقة دم، وإنه يأتي يوم القيامة بقرونها وأظلافها وأشعارها وإن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع على الأرض فطيبوا بها نفسا (أخرجه ابن ماجة برقم ৩১২৬ والترمذي برقم ১৪৯৩ والحاكم (৪/ ২২১-২২২  وانظر فقه الأضحية)
 “আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত, নবী বলেন, “কুরবানীর দিনে কোন আদম সন্তান কুরবানীর পশুর খুন ঝরানোর চেয়ে মহান আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আমল করেনা। সে কিয়ামত দিবসে উক্ত পশুর শিং, খুর, লোম প্রভৃতি নিয়ে উপস্থিত হবে। এবং তার খুন জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর নির্ধারিত মর্যাদার স্থানে পতিত হয়। অতএব, তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানীকর।” (ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৬, তিরমিযী, হা/১৪৯৩, হাকেম৪ /২২১-২২২ দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহঃ)
মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। কারণ, হাদীছটির সনদে কয়েকটি দোষ আছে:
১)        উক্ত হাদীছের সনদে আব্দুল্লাহ বিন নাফে নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। তার স্মৃতি শক্তিতে দুর্বলতা ছিল।
২)        হাদীসটির সনদে আবুল মুসান্না নামক আরেকজন রাবী রয়েছে তার আসল নাম হল সুলাইমান বিন ইয়াজিদ। তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও বাজে। (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যা)
৩)        উক্ত হাদীছের প্রায় অনুরূপ হাদীছ ইমাম আব্দুর বাযযাক তার মুছান্নাফ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। (হা/৮১৬৭) উক্ত হাদীসটির সনদেও আবু সাঈদ শামী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে তিনি একজন ‘পরিত্যক্ত’ রাবী। (দ্রঃ প্রাগুক্ত)
২নং হাদীছঃ
 عن زيد بن أرقم قال قال أصحاب رسول الله: يارسول الله ماهذه الأضاحي؟ قال:))سنة أبيكم إبراهيم(( قالوا: فما لنا فيها؟ قال:))بكل شعرة حسنة((، قالوا: فالصوف يارسول الله؟! قال ))بكل شعرة من الصوف حسنة((
 “যায়েদবিন আরকাম (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানীর পশুগুলির তাৎপর্য কি? (কেন আমরা এগুলো যবেহ করে থাকি?) তিনি বললেন: “ইহা তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)  এর সুন্নত।” তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, এতে আমাদের কী সওয়াব রয়েছে? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে।” তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, পশমের মধ্যে যে ছোট ছোট লোম রয়েছে ওগুলোরও কি বিনিময় তাই? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “ছোট ছোট প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে।” (ইবনু মাজাহ্, হা/৩১২৭, আহমাদ (৪/৩৬৮), ইবনু হিব্বান ফিল মাজরুহীন (৩/৫৫))
মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। কারণ, এ হাদীসটির সনদে আবু দাউদ আল আম্মী নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। তার প্রকৃত নাম হল, নুফাই ইবনুল হারিস। সে মুহাদ্দিসগণের নিকট ‘পরিত্যক্ত’ রাবী। এতে আরও একজন রাবী রয়েছে তার নাম হল আয়েযুল্লাহ, সে ‘যঈফ’ রাবী।
৩নং হাদীছঃ
 عن أبي سعيد الخدري قال قال رسوالله صلى الله عليه وسلم لفاطمة عليها الصلاة والسلام!)) قومي إلى أضحيتك فاشهديها فإن لك بأول قطرة تقطر من دمها يغفر لك ماسلف من ذنوب((، قالت: يارسول الله! هذا لنا أهل البيت خاصة أو لنا وللمسلمين عامة؟  قال:))لنا وللمسلمين عامة(( ( رواه الحاكم ৪/২২২ والبزار ২/ ৫৯ مع كشف الأستار )
আবু সাঈদ খুদরী (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  ফাতেমা (রা:) কে বললেন, “(হে ফাতেমা!) তুমি তোমার কুরবানীর পশুর নিকট (যবেহ কালীন) দাঁড়াও এবং উপস্থিত থাক, কারণ তার প্রথম ফোটা খুন (জমিনে) পড়ার সাথে সাথে তোমার অতীতের গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হবে।” ফাতেমা (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি আমরা আহলুল বায়ত তথা নবী পরিবারের জন্যই খাস নাকি তা আমাদের জন্য এবং সাধারণভাবে সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আমাদের জন্য এবং সাধারণভাবে সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য।” (হাকেম ৪/২২২) বাযযার ২/৫৯ কাশফুল আসতার)
মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। কারণ, এর সনদে আব্দুল হামীদ নামে একজন রাবী রয়েছে যে যঈফ। আরেকটি কারণ হল, এর সনদে আতিয়া আল আওফী নামে আরেকজন রাবী রয়েছে সেও যঈফ এবং মুদাল্লিস। আবু হাতিম তার ইলাল (علل) গ্রন্থে (হা/৩৮) বলেন, “এটি একটি ‘মুনকার’ হাদীছ।” (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহঃ ১০(
৪নং হাদীছঃ
عن علي رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لفاطمة:  يا فاطمة فاشهدي أضحيتك أما إن لك بأول قطرة من دمها مغفرة لكل ذنب أما إنه يجاء بها يوم القيامة بلحومها ودمائها سبعين ضعفا حتى توضع في ميزانك
আলী (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: “হে ফাতেমা! তুমি তোমার কুরবানীর পশুর নিকট জবেহ করার সময় উপস্থিত থাকিও। জেনে রেখ, ঐ পশুর রক্তের প্রথম ফোটা (মাটিতে) পড়ার সাথে সাথে তোমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। জেনে রেখ! কিয়ামত দিবসে কুরবানীর ঐ পশুগুলিকে রক্ত, মাংস সহ সত্তরগুণ বৃদ্ধি করে নিয়ে আসা হবে এবং তোমার দাঁড়িপাল্লায় তা রাখা হবে।” (বাইহাকী (৯/২৮৩) আবদুবনু হুমাইদ (৭/৮)
মন্তব্য: এ হাদীছের সনদে আমর বিন খালিদ ওয়াসেতী রয়েছে সে একজন ‘পরিত্যক্ত’ রাবী। অনুরূপ হাদীছ ইমাম আব্দুর রাযযাক যুহরী হতে ‘মুরসাল’ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসটির সনদে আব্দুল্লাহ বিন মুহাররার নামক একজন রাবী রয়েছে, তিনিও অত্যন্ত যঈফ। অনুরূপ হাদীছ ইমরান বিন হুসাইন হতে বায়হাকী (৯/২৮৩), হাকিম (৪/২২২) এবং তাবারানী (১৮/২৩৯) প্রমুখগণ তাদের স্ব স্ব কিতাবে বর্ণনা করেছেন)। উক্ত হাদিছটিকে ইমাম তায়ালিসী (মুসনাদ তায়ালিসী, হা/২৫৩০) ও ইবনু আদী (৭/২৪৯২) বর্ণনা করেছেন। তবে তার সনদেও দুজন যঈফ রাবী রয়েছে তারা হলেন, নাযর বিন ইসমাইল এবং আবু হামযাহ্ শেমালী। (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহ্)
৫নং হাদীছঃ
عن على عن النبي صلى الله عليه وسلم : ))ياأيها الناس  ضحوا واحتسبوا بدمائها وإن الدم وإن وقع في الأرض  فإنه يقع في حرز الله عزو جل(( رواه الطيالسي برقم ৮৩১৫ ،والطبراني في الأوسط  وفيه موسى بن زكريا وعمرو بن الحصين العقيلي وهما متروكان ، انظر: فقه الأضحية ومجمع الزوائد ৪/১৭)
 আলী (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, (তিনি বলেন) “হে মানব মণ্ডলী! তোমরা কুরবানী কর এবং তার খুনকে সওয়াব লাভের মাধ্যম মনে কর। নিশ্চয়ই কুরবানীর পশুর খুন জমিনে পতিত হলে তা আল্লাহর হেফাজতে চলে যায়।” [আবু দাউদ তায়ালেসী (হা ৮৩১৫)।]
মন্তব্য: হাদীসটির সনদে মুসা বিন যাকারিযা এবং আমর ইবনুল হুসাইন রয়েছে। তারা উভয়ে ‘পরিত্যক্ত’ রাবী।
৬ নং হাদীছ:
عن عبد الله ابن عباس رضى الله عنهما قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:  ماأنفقت الورق في شيئ أحب إلى الله من نحر ينحر يوم عيد (رواه الطبراني(১১/১৭)  والدارقطني )৪/২৮২( والشجري في الأمالي )২/৭৯-৮০( وفي إسناده إبراهيم بن يزيد الخوزي وهو متروك ، انظر: فقه الأضحي)
অর্থ: “আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  বলেছেন: “চাঁদি (টাকা-পয়সা) যেসব ক্ষেত্রে খরচ করা হয় তার মধ্যে আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয় হল কুরবানী যা ঈদের দিনে  যবেহ করা (তাবারানী ১১/১৭) দারাকুতনী ৪/২৮২ প্রভৃতি।
হাদীসটির সনদে ইবরাহীম বিন ইয়াজিদ আল খোযী নামক একজন পরিত্যক্ত রাবী রয়েছে।
৭নং হাদীছ:
عن الحسين بن علي قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((من ضحى طيبة بها نفسه محتسبا لأضحيته كانت له حجابا من النار ( رواه الطبراني ৩/ ৮৪، وفي إسناده : أبو داود النخعي (سليمان بن عمرو وهو كذاب
 অর্থ: হুসাইন ইবনু আলী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কুরবানীর পশুকে খুশী মনে ও নেকীর আশায় যবেহ করবে তার এই কুরবানীর পশু জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পর্দা বা অন্তরায় হয়ে যাবে।”
মন্তব্য: এটি একটি মওযূ বা জাল হাদীস। এর সনদে আবু দাউদ নাখঈ (যার প্রকৃত নাম সুলাইমান বিন আমর) নামক একজন মহা মিথ্যুক রাবী রয়েছে।
৮নং হাদীছঃ
عن عبدالله بن عباس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (( في يوم أضحى ))ماعمل ابن آدم في هذا اليوم أفضل من دم يهراق في سبيل الله إلا أن يكون رحما مقطوعة توصل(( (رواه الطبراني ১১)/  وفي إسناده الحسن بن يحى الخشني وهو صدوق كثير الغلط وفيه ليث ابن أبي  سليم وإسماعيل بن عياش وكلاهما ضعيف، انظر: فقه الأضحية
অর্থ: আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  কুরবানীর দিন বললেন, “কোন অদম সন্তান এই দিনে (কুরবানীর) খুন প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক সৎ আমল করে না। তবে ছিন্ন আত্মীয়তা সম্পর্ককে আবার অবিচ্ছিন্ন করার কথা ভিন্ন। (তাবারানী ১১/৩২)
মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। এর সনদে হাসান বিন ইয়াহয়া আল খোশানী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। তিনি সত্যবাদী তবে প্রচুর ভুল করতেন। আরেকজন বর্ণনাকারী রয়েছে তার নাম লাইস বিন আবী সুলাইম তিনিও একজন যঈফ রাবী। এতে ইসমাইল বিন আয়্যাশ নামক অপর এক জন রাবী রয়েছে। তিনি যখন তিনি শামবাসী ছাড়া অন্য এলাকার মুহাদ্দিস গনের নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করবেন তখন তার হাদীস যঈফ বলে বিবেচিত হবে। আর এখানে তিনি শামবাসী ছাড়া অন্যদের থেকে হাদীসটি বর্ণনা করায় তা যঈফের অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপ হাদীছ ইবনু আব্দুল বার তার ইস্তেযকার (৫/১৬৪) ও তামহীদ (২৩/১৯২) গ্রন্থে ইবনু আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করে সেটাকে ‘গারীব’ হাদীছ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটির সনদে সাঈদ বিন যায়দ নামক যঈফ বারী রয়েছে। তিনি ইমাম মালিক (রহঃ) হতে মুনকার বা অগ্রহণীয় অনেক কিছু বর্ণনা করতেন। (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহঃ ১১)
৯ নং হাদীছঃ 
عن أبي هريرة عن النبي  قال: استفرهوا ضحاياكم فإنها مطاياكم على الصراط – رواه الديلمي في مسند الفردوس )১/৮৫( وهوحديث ضعيف جدا ، انظر : فقه الأضحية )
অর্থ: আবু হুরাইরা (রা:) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “তোমরা তোমাদের কুরবানীর পশুগুলো শক্তিশালী ও মোটা-তাজা দেখে নির্বাচন কর। কারণ এগুলো তোমাদের পুলসিরাতের উপর চড়ে যাওয়ার বাহন হবে।” (দাইলামী-মুসনাদুল ফিরদাউস ১/৮৫)
মন্তব্য: হাদীছটি অত্যন্ত যঈফ। হাফেয ইবনু হাজার তালখীছুল হাবীর গ্রন্থে (৪/১৩৮) বলেন: “হাদীছটি মুসনাদুল ফিরদাউস গ্রন্থের গ্রন্থকার ইবনুল মুবারক এর সূত্রে ইয়াহয়্যা বিন ওবায়দুল্লাহ্ বিন মাওহাব বর্ণনা করেছেন তার পিতা থেকে। তিনি আবু হোরায়রা হতে মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন …..। তবে সনদে বর্ণিত ইয়াহয়্যা অত্যন্ত যঈফ। হাদীছটি ইমাম আলবানীও যঈফ বলেছেন। (দ্রঃ যঈফুল জামে হা/৯২৪)
১০ নং হাদীছঃ
عن عبد الله بن عمرو بن العاص أن النبي  قال:)) أمرت بيوم الأضحى عيدا جعله الله لهذه الأمة(( قال الرجل: أرأيت إن لم أجد إلا منيحة أنثى أفأضحي بها؟ قال:))لا، ولكن تأخذ من شعرك وأظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فتلك تمام أضحيتك عندالله(( ( أخرجه أبو داود برقم ২৭৮৮ وهو حديث ضعيف )
অর্থ: আমর ইবনুল ’আস হতে বর্ণিত। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  বলেছেন: “আমি কুরবানীর দিনকে ঈদ হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ প্রাপ্ত হয়েছি যা আল্লাহ এই উম্মতের জন্য নির্ধারণ করে দিয়