যিলহজ, ঈদ ও কোরবানি


যিলহজ, ঈদ ও কোরবানি

সূচীপত্র
ভূমিকা
অনুবাদকের কথা
যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত ও আমল
১-যিলহজ মাসের প্রথম দশকের ফজিলত
২-যিলহজ মাসের প্রথম দশকে নেক আমলের ফজিলত
যিলহজের প্রথম দশ দিনে যে সকল নেক আমল করা যেতে পারে
১-খাঁটি মনে তওবা করা
২-তওবা কবুলের শর্ত
৩-হজ ও ওমরাহ আদায় করা
৪-নিয়মিত ফরজ ও ওয়াজিব সমূহ আদায়ে যত্নবান হওয়া
৫-বেশি করে নেক আমল করা
৬-আল্লাহ তাআলার জিকির করা
৭-উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করা
৮-সিয়াম পালন করা
৯-কোরবানি করা
১০-ঈদের সালাত আদায় করা
আরাফাহ দিবস
১-আরাফাহ দিবসের ফজিলত
২-আরাফাহ দিবসে যে সকল আমল শরিয়ত দ্বারা প্রমাণিত
কোরবানির দিন
১-কোরবানির দিনের ফজিলত
২-কোরবানির দিনের করণীয়
আইয়ামুত-তাশরীক ও তার করণীয়
১-আইমুত তাশরীক এর ফজিলত
২- আইমুত তাশরীকে করণীয়
ঈদের তাৎপর্য ও করণীয়
১-ঈদের সংজ্ঞা
২-ইসলামে ঈদের প্রচলন
৩-ঈদের তাৎপর্য
৪-ঈদের দিনের করণীয়
(১) ঈদের দিন গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সুগন্ধি ব্যবহার
(২) ঈদের দিনে খাবার গ্রহণ প্রসঙ্গে
(৩) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
(৪) ঈদের তাকবীর আদায়
ঈদের সালাত
১- ঈদের সালাতের হুকুম
২-ঈদের সালাত আদায়ের সময়
৩-ঈদের সালাত কোথায় আদায় করবেন ?
৪-ঈদের সালাতের পূর্বে কোন সালাত নেই
৫- ঈদের সালাতে কোন আজান ও একামত নেই
৬- ঈদের সালাতে মহিলাদের অংশ গ্রহণের নির্দেশ
৭-ঈদের সালাত আদায়ের পদ্ধতি
৮-ঈদের খুতবা শ্রবণ
৯-ঈদের সালাতের কাজা আদায় প্রসঙ্গে
১০-ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ভাষা
১১-আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নেয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া
ঈদে যা বর্জন করা উচিত
১-কাফেরদের সাথে সাদৃশ্যতা রাখে এমন ধরনের কাজ বা আচরণ
২-পুরুষ কর্তৃক মহিলার বেশ ধারণ ও মহিলা কর্তৃক পুরুষের বেশ ধারণ
৩-ঈদের দিনে কবর জিয়ারত
৪-বেগানা মহিলা পুরুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ
(ক) মহিলাদের খোলা-মেলা অবস্থায় রাস্তা-ঘাটে বের হওয়া
(খ) মহিলাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ
৫-গান-বাদ্য
কোরবানি : তাৎপর্য ও আহকাম
কোরবানির অর্থ ও তার প্রচলন
কোরবানির বিধান
কোরবানির ফজিলত
কোরবানির শর্তাবলি
কোরবানির নিয়মাবলি
১-কোরবানির পশু কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা
২-কোরবানির ওয়াক্ত বা সময়
৩-মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি
৪-অংশীদারির ভিত্তিতে কোরবানি করা
৫-কোরবানি দাতা যে সকল কাজ থেকে দূরে থাকবেন
৬-কোরবানির পশু জবেহ করার নিয়মাবলি
৭-জবেহ করার সময় যে সকল বিষয় লক্ষণীয়
৮-কোরবানির গোশত কারা খেতে পারবেন

ভূমিকা
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله ، وبعد:
যিলহজ মাসের প্রথম দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ দশকে এবাদত-বন্দেগির তুলনায় আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় অন্য কোনো কাল ও সময় নেই মর্মে হাদিসে এসেছে।
আরাফা দিবস মাগফেরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভের শ্রেষ্ঠ দিবস, যে দিবসের রোজা বিগত ও আগত এক বছরের পাপের কাফ্‌ফার্তাএ দিবসটিও যিলহজ মাসের প্রথম দশকেই অবস্থিত। ইয়াউমুন নাহর―যা হাদিস অনুযায়ী সমধিক মহিমান্বিত দিবস বলে খ্যাত্তযিলহজ মাসের প্রথম দশকেই অবস্থিত।
বড় ঈদ ও কোরবানি এ দশকেই স্থান পেয়েছে। সে হিসেবে যিলহজ মাসের প্রথম দশকের গুরুত্ব অন্যান্য দিবসকে ছাপিয়্তেশবে কদর বাদ্তেসর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তবে দু:খের ব্যাপার হল, যিলহজ মাসের প্রথম দশক আদৌ কোনো গুরুত্বের ব্যাপার নয় ;্তঅন্তত আমাদের দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। সর্বোত্তম দিবসগুলোর ব্যাপারে এই উদাসীনতার আড়ালের কারণ কী তা আমাদের জানা নেই। তবে আশা করা যায়, আমাদের বর্তমান প্রকাশনাটি এ বিষয়ে সাধারণ পাঠকশ্রেণির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
প্রাজ্ঞ গবেষক ও অনুবাদক আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান আরবি থেকে বইটি অনুবাদ করে একটি শূন্যতা পূরণ করেছেন্তসন্দেহ নেই। এ জন্য তিনি আমাদের সকলের ধন্যবাদ পাবার উপযোগী। নুমান বিন আবুল বাশার, কাউসার বিন খালেদ অত্যন্ত যত্নের সাথে সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আবহাস এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ সোসাইটির পরিচালকবৃন্দ বইটির সার্বিক সৌন্দর্য-বর্ধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তাদের সবাইকে আল্লাহ তাআলা জাযায়ে খায়ের দান করুন।
আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বইটি প্রকাশ করতে পেরে সত্যি আমরা আনন্দিত ও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ আমাদের শ্রম কবুল করুন। আমিন।
মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক
মহাপরিচালক:আবহাস এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ সোসাইটি
পরিচালক: বাংলা বিভাগ- ইসলামহাউজ.কম
অনুবাদকের কথা
জগৎ সমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য সকল প্রশংসা। তার রহমত ও আমাদের হৃদয়-নিংড়ানো সালাম সাইয়েদুল মুরসালিন ও তার সহচরগণের প্রতি সর্বদা নিবেদিত হোক।
আমাদের দেশের কোন ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলিমকে আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন ‘যিলহজ মাসের দশ তারিখে কোরবানি ঈদ। এর পূর্বের দিনগুলোর তাৎপর্য-ফজিলত, করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?’ সে উত্তরে বলব্তে’যারা কোরবানি করবে তারা এ দিনগুলোতে গরু-ছাগলের হাটে যাবে, কোরবানির জন্য পশু ক্রয় করবে।’ ব্যস ! এ ছাড়া আর কি করার আছে ?
হ্যাঁ যিলহজ মাসের প্রথম দশক ও এর করণীয় সম্পর্কে আমরা একেবারেই বে-খবর।
আর এ গাফিলতির নিদ্রা অবসানের লক্ষ্যে প্রখ্যাত গবেষক ফায়সাল বিন আলী বাদানি ও আবু আনাস খায়রুল্লাহর তত্ত্বাবধানে আরবী ভাষায় খুবই কার্যকরী একটি তথ্যবহুল গ্রন্থ বাজারে আসে, বর্তমান সমাজ ও সামাজিক অবস্থার বিবেচনায় যা খুবই প্রয়োজনীয় বলে আমি মনে করি।
সাত বছর পূর্বে যখন কিতাবটি হাতে আসে তখন এর অনুবাদ করার প্রয়োজন অনুভব করি। আমাদের দেশে এ বিষয়ে লেখা কোন বই নেই্তযতদূর আমি খোঁজ-খবর নিয়েছ্তিতেমনি এ বিষয়ে তেমন আলোচনাও চোখে পড়ে না। যখন হাটহাজারীর দারুল উলুমে দাওরায়ে হাদিস শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলাম, তখন দেখেছি আমাদের মুহসিন আসাতেজায়ে কেরাম যিলহজ মাস আসার পূর্বেই আশে-পাশের মহল্লার লোকজনকে ডেকে আলোচনা সভা করে এ বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দিতেন। মনে করেছিলাম তাঁদের এ সুন্দর উদ্যোগ দেশের সর্বত্র প্রসারিত হবে, মানুষ এ বিষয়ে সচেতন হবে। কিন্তু তা আশানুরূপ হয়নি।
এ কিতাবে শুধু যিলহজ মাসের ফজিলত, কোরবানি ও ঈদ সম্পর্কে আলোচনা হয়নি। এ সকল বিষয়ের সাথে সাথে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন তওবা কবুলের শর্তাবলি, গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করার পরিণাম, গান-বাদ্যের হুকুম্তইত্যাদি বহু বিষয়, যা মুসলিম সমাজে প্রসার করা অতীব প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
আল্লাহর ফজলে বর্তমানে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মাঝে মূলের দিকে ফিরে যাওয়ার একটা চেতনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর প্রভাবে মুসলমানগণ সবকিছু কোরআন ও হাদিসের আশ্রয়ে জানতে ও বুঝতে চায়। এ এক বিরাট অগ্রগতি ও জাগরণের লক্ষণ্তসন্দেহ নেই। সামাজিকভাবে এ পরিস্থিতির উদ্ভবের পূর্বের প্রেক্ষাপটে আমরা লক্ষ্য করি যে, মানুষের ইসলাম সম্পর্কে যখন কোন কিছু বুঝার দরকার হত তখন কোন আলেমের শরণাপন্ন হত। তিনি যা বলতেন তা মেনে নিত। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা নেই। কোন কিছু বললে জানতে চাওয়া হয় এটা কোথায় আছে ? এর দলিল-প্রমাণ কি ?্তইত্যাদি। এ চাহিদার প্রতি খেয়াল রেখে সংকলকবৃন্দ সকল মাসআলার কোরআন-হাদিস ভিত্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। তাই এ বই-এর মাধ্যমে আলেম-উলামা, দাওয়াত-কর্মী ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট যে কেউ উপকৃত হবেন বেশি। তাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। এমনিভাবে এর থেকে ইস্তেফাদা অব্যাহত থাকবে এবং এ প্রচেষ্টার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব লাভ করবেন আল্লাহর মেহেরবানিতে। এটাই আমাদের সকলের জন্য বিরাট অর্জন।
আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
২৯-১০-১৪২৮ হিজরি
যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত ও আমল
যিলহজ মাসের প্রথম দশকের ফজিলত
ইসলামে যতগুলো মর্যাদাবান ও ফজিলতপূর্ণ দিবস রয়েছে তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হল যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। এর মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অনেক বাণী রয়েছে। এ সংক্রান্ত কতিপয় আয়াত ও হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হল্ত
(১) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে এ দিবসগুলোর রাত্রি সমূহের শপথ করেছেন। আমরা জানি আল্লাহ তাআলা যখন কোন বিষয়ের শপথ করেন তখন তা তার গুরুত্ব ও মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। তিনি এরশাদ করেন,
وَالْفَجْرِ ﴿১﴾ وَلَيَالٍ عَشْرٍ ﴿২﴾
‘শপথ ফজরের ও দশ রাতের’।[১]
সাহাবি ইবনে আব্বাস রা., ইবনে যুবাইর ও মুজাহিদ রহ. সহ আরো অনেক মুফাসসিরে কেরাম বলেছেন যে, দশ রাত বলতে এ আয়াতে যিলহজ মাসের প্রথম দশ রাতের কথা বলা হয়েছে। ইবনে কাসীর রহ. বলেছেন্ত’এ মতটিই বিশুদ্ধ।'[২]
নবী কারীম স. থেকে এ দশ রাতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে কোন বাণী পাওয়া যায় না।
(২) রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন : যিলহজের প্রথম দশ দিন হল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন। এ প্রসঙ্গে বহু হাদিস এসেছে। যার কয়েকটি তুলে ধরা হল,
১.
عن ابن عباس- رضى الله عنهما- أن النبى- صلى الله عليه وسلم- قال : ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذه الأيام العشر، فقالوا يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم- : ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء. (رواه البخاري ৯৬৯ والترمذي ৭৫৭ واللفظ له)
সাহাবি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন : যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মত প্রিয় আল্লাহর নিকট আর কোন আমল নেই। তারা প্রশ্ন করলেন হে আল্লাহর রাসূল ! আল্লাহর পথে জিহাদ করা কি তার চেয়ে প্রিয় নয় ?
রাসূলুল্লাহ স. বললেন : না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়ে গেল অত:পর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে এল না।[৩]
২.
عن عبد الله بن عمر- رضى الله عنهما- عن النبى- صلى الله عليه وسلم- قال : ما من أيام أعظم عند الله، ولا أحب إليه من العمل فيهن من هذه العشر، فأكثروا فيهن من التهليل والتكبير والتحميد.) رواه أحمد ১৩২ وقال أحمد شاكر :إسناده صحيح)
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত নবী কারীম স. বলেছেন : এ দশ দিনে (নেক) আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি করে পাঠ কর।[৪]
৩.
ما من أيام أفضل من أيام عشر ذي الحجة، قال : فقال رجل : يا رسول الله، هن أفضل أم عدتهن جهاداً في سبيل الله ؟ قال : هن أفضل من عدتهن جهادا في سبيل الله…(صحيح ابن حبان ৩৮৫৩ و ذكر محققه أنه حديث صحيح انظر ৯১৬৪)
যিলহজের প্রথম দশ দিনের চাইতে উত্তম কোন দিন নেই। বর্ণনাকারী বলেন, জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল ! এ দশ দিন (আমলে সালেহ) উত্তম, না আল্লাহর পথে জিহাদের প্রস্তুতি উত্তম ? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদের প্রস্তুতি চেয়ে তা (আমল) উত্তম।[৫]
এ তিন হাদিসের অর্থ হল- বছরে যতগুলো পবিত্র দিন আছে তার মাঝে এ দশ দিনের প্রতিটি দিন হল সর্বোত্তম। যেমন এ দশ দিনের অন্তর্গত কোন জুমআর দিন অন্য সময়ের জুমআর দিন থেকে উত্তম বলে বিবেচিত।
(৩) আল্লাহর রাসূল স. এ দিনসমূহে নেক আমল করার জন্য তার উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তার এ উৎসাহ এ সময়ের ফজিলত প্রমাণ করে।
(৪) নবী কারীম স. এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আলোচিত হয়েছে উপরে ইবনে আব্বাসের হাদিসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,
لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ . (الحج : ২৮)
‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিন সমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।'[৬]
এ আয়াতে নির্দিষ্ট ‘দিনসমূহ’ বলতে কোন দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে এ সম্পর্কে ইমাম বোখারি রহ. বলেন,
قال ابن عباس: أيام العشر
‘ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন : ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।'[৭]
(৫) যিলহজ মাসের প্রথম দশকে রয়েছে আরাফা ও কোরবানির দিন। আর এ দুটো দিনের রয়েছে অনেক বড় মর্যাদা। যেমন হাদিসে এসেছে,
عن عائشة- رضى الله عنها- قالت : إن رسول الله- صلى الله عليه وسلم- قال : ما من يوم أكثر من أن يعتق الله فيه عبداً من النار من يوم عرفة، وإنه ليدنو ثم يباهي بهم الملائكة، فيقول : ما أراد هؤلاء؟ .( رواه مسلم ১৩৪৮)
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ স. বলেন : ‘আরাফার দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন- ‘তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দাগণ আমার কাছে কি চায় ?'[৮]
আরাফাহ (যিলহজ মাসের নবম তারিখ)-এ-দিনটি ক্ষমা ও মুক্তির দিন। এ দিনে সওম পালন করলে তা দু বছরের গুনাহের কাফ্‌ফারা হিসেবে গণ্য হয়। যেমন হাদিসে এসেছে,
عن أبي قتادة- رضى الله عنه- أن رسول الله – صلى الله عليه وسلم- قال :…صيام يوم عرفة احتسب على الله أن يكفرا السنة التي قبله والسنة التي بعده )…رواه مسلم ১৬৬২)
সাহাবি আবু কাতাদাহ রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ স. বলেন : ‘আরাফার দিনের সওম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিগত ও আগত বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গ্রহণ করেন।'[৯]
তবে আরাফার এ দিনে আরফাতের ময়দানে অবস্থানকারী হাজীগণ সওম পালন করবেন না। কোরবানির দিনের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে :
عن عبد الله بن قرط- رضى الله عنه- قال: قال رسول الله- صلى الله عليه وسلم- : أعظم الأيام عند الله تعالى يوم النحر، ثم يوم القر. (رواه أبو داود ১৭৬৫ وصححه الألباني ১৫৫২)
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে কুর্ত রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন : ‘আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে উত্তম দিন হল কোরবানির দিন তারপর কোরবানি পরবর্তী মিনায় অবস্থানের দিনগুলো।'[১০]
(৬) যিলহজ মাসের প্রথম দশকের এ দিনগুলো এমন মর্যাদাসম্পন্ন যে, এ দিনগুলোতে সালাত, সওম, সদকা, হজ ও কোরবানি আদায় করা হয়ে থাকে। অন্য কোন দিন এমন পাওয়া যায় না যাতে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল একত্র হয়।
একটি জিজ্ঞাসা : রমজানের শেষ দশক অধিক ফজিলতপূর্ণ না কি যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন বেশি ফজিলতসম্পন্ন ?
যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিবস অধিক ফজিলতপূর্ণ- এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। করণ, এ বিষয়ে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে। তবে মতভেদের অবকাশ রয়েছে রাত্রির ফজিলত নিয়ে। অর্থাৎ, রমজানের শেষ দশকের রাত বেশি ফজিলতপূর্ণ না যিলহজের প্রথম দশকের রাতসমূহ বেশি ফজিলতের অধিকারী ?
বিশুদ্ধতম মত হল, রাত হিসেবে রমজানের শেষ দশকের রাতগুলো ফজিলতের দিক দিয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী। আর দিবসের ক্ষেত্রে যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিবস অধিক মর্যাদার অধিকারী।
ইবনে রজব রহ. বলেন : যখন রাত্র উল্লেখ করা হয় তখন দিবসগুলোও তার মাঝে গণ্য করা হয়। এমনিভাবে, যখন দিবস উল্লেখ করা হয় তখন তার রাত্রিগুলো তার মাঝে গণ্য হয়- এটাই নিয়ম। এ ক্ষেত্রে শেষ যুগের উলামায়ে কেরাম যা বলেছেন সেটাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। তাহল, সামগ্রিক বিচারে যিলহজ মাসের প্রথম দশকের দিবসগুলো রমজানের শেষ দশকের দিবস সমূহের চেয়ে অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন। আর রমজানের শেষ দশকের লাইলাতুল কদর হল সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন।
ইবনুল কায়্যিম রহ. এ ক্ষেত্রে সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন : রমজানের শেষ দশকের রাতগুলো সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ। কারণ, তাতে লাইলাতুল কদর রয়েছে। অপরদিকে, যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের দিবসসমূহ অধিকতর ফজিলতপূর্ণ, কারণ এ দিনগুলোতে তালবীয়াহ-এর দিন, আরাফার দিন, কোরবানির দিন রয়েছে।[১১]
যিলহজ মাসের প্রথম দশকে নেক আমলের ফজিলত
عن ابن عباس- رضى الله عنهما- أن النبى- صلى الله عليه وسلم- قال : ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذه الأيام العشر، فقالوا يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم- : ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء. (رواه البخاري ৯৬৯ والترمذي ৭৫৭ واللفظ له)
সাহাবি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন : যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মত প্রিয় আল্লাহর নিকট আর কোন আমল নেই। তারা (সাহাবিগণ) প্রশ্ন করলেন হে আল্লাহর রাসূল ! আল্লাহর পথে জিহাদ করা কি তার চেয়ে প্রিয় নয় ?
রাসূলুল্লাহ স. বললেন : না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়ে গেল অত:পর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে এল না।[১২]
ইবনে রজব রহ. বলেছেন : বোখারির এই হাদিসটি দ্বারা বুঝা যায় যে, নেক আমল করার মৌসুম হিসেবে যিলহজ মাসের প্রথম দশক হল সকল দিবসসমূহের চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে অধিক প্রিয়। যা আল্লাহর কাছে অধিকতর প্রিয় তা তাঁর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন। হাদিসের কোন কোন বর্ণনায় আহাব্বু (প্রিয়) শব্দটি এসেছে আবার কোন কোন বর্ণনায় আফজালু (মর্যাদাসম্পন্ন) কথাটা এসেছে।
অতএব এ সময়ে নেক আমল করা বছরের অন্য যে কোন সময়ে নেক আমল করার চেয়ে বেশি মর্যাদা ও ফজিলতের অধিকারী হবে। তাই তো এ সময়ে হজ, কোরবানির মত গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ সম্পন্ন করা হয়।
যিলহজের প্রথম দশ দিনে যে সকল নেক আমল করা যেতে পারে
খাঁটি মনে তওবা করা-
তওবার অর্থ প্রত্যাবর্তন বা ফিরে যাওয়া। যে সকল কথা ও কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অপছন্দ করেন তা থেকে যে সকল কথা ও কাজ আল্লাহ পছন্দ করেন তাঁর দিকে ফিরে যাওয়ার নাম তওব্তাহোক এ সকল কাজ প্রকাশ্যে বা গোপনে। সাথে সাথে অতীতের এ ধরনের কাজ থেকে অনুতপ্ত হতে হবে, কাজগুলো ত্যাগ করতে হবে ও দৃঢ় সংকল্প করতে হবে যে ঐ ধরনের কাজ আর কোন দিন করব না। আরো সংকল্প করতে হবে যে, আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় কাজ যেমন আদায় করব তেমনি তার নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার করব।
যখনই কোন পাপ কাজ সংঘটিত হবে তখন সাথে সাথে তা থেকে তওবা করা একজন মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। কেননা, তার জানা নেই কখন তার মৃত্যু হবে আর কতক্ষণ সে বেঁচে থাকবে। মনে রাখতে হবে, একটি পাপ বা গুনাহ অন্য আরেকটি গুনাহের দ্বার খুলে দেয়। তওবা না করলে এমনিভাবে গুনাহের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর সময়ের মর্যাদা হিসেবে গুনাহের শাস্তি বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অধিক মর্যাদাসম্পন্ন বা ফজিলতপূর্ণ সময়ে গুনাহের কাজের শাস্তি বেশি হয়। প্রথমত গুনাহের শাস্তি দ্বিতীয়ত ফজিলতপূর্ণ সময়ের অবমাননা ও অবমূল্যায়ন করার শাস্তি।
ইমাম নবভী রহ. বলেন : ‘মুসলিম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হল সকল ধরনের গুনাহ থেকে তওবা করা যা সে করেছে। যদি কোন এক ধরনের গুনাহ থেকে তওবা করে তাহলেও তার তওবা সঠিক হবে। তবে অন্য গুনাহের তওবা তার দায়িত্বে থেকে যাবে। কোরআনের বহু আয়াত, একাধিক হাদিস ও ইজমায়ে উম্মাহ তওবা ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বহন করে।[১৩] আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آَمَنُوا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . (التحريم : ৮)
‘হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা র্কতবিশুদ্ধ তওবা ; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দেবেন না নবীকে এবং তার মোমিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সম্মুখে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। তারা বলবে ‘হে আমাদের প্রতিপালক ! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।'[১৪]
ইবনে কায়্যিম রহ. বলেন : খাঁটি তওবা (তওবা নাছুহ) হল তিনটি বিষয়ের সমষ্টির নাম। প্রথম : সকল প্রকার গুনাহ থেকে তওবা করা। এমন যেন না হয় কয়েকটি গুনাহ থেকে তওবা করলাম, দু একটি রেখে দিলাম এ ভেবে যে এ থেকে আরো কয়েক দিন পরে তওবা করব। এমন করলেও তওবা হবে, তবে তা তওবা নাছূহ হিসেবে গৃহীত হবে ন্তাযে তওবা করতে আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতে কারীমায় নির্দেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয় : সম্পূর্ণভাবে পাপ পরিত্যাগ করার জন্য সততার সাথে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। এমন যেন না হয় যে তওবা করলাম আর মনে মনে বললাম জানি না, আমি এ তওবার উপর অটল থাকতে পারব কি-না।
তৃতীয় : তওবা খালেছভাবে আল্লাহকে ভয় করে ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষেই করতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকবে না।
অবশ্যই এ তওবার সাথে আল্লাহ তাআলার কাছে অব্যাহতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা ও সকল গুনাহ বা পাপ নিজের থেকে মিটিয়ে দিতে হবে। তা হলেই কামেল তওবা বলে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।[১৫]
তওবা কবুলের শর্ত
সাধারণভাবে তওবা কবুলের জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে।
(১) তওবা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন নিয়তে করলে তওবা হবে না। মানুষকে দেখানোর জন্য বা শোনানোর জন্য বা অন্য কোন স্বার্থ হাসিলের স্বার্থে তওবা করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :
فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ (الزمر : ২)
সুতরাং আল্লাহর এবাদত কর, তার আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে।[১৬]
তওবা করা যেহেতু একটি এবাদত তাই তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যেই করতে হবে।
(২) যে পাপ বা গুনাহ করা হয়েছে তার জন্য অনুতপ্ত হতে হবে, আফসোস করতে হবে। কেননা হাদিসে এসেছে :
الندم توبة (صحيح الجامع رقم ৬৮২০)
‘অনুতপ্ত হওয়ার নামই তওবা।'[১৭]
তাই যে গুনাহ হয়ে গেছে তার জন্য আন্তরিকভাবে দু:খিত হতে হবে।
(৩) গুনাহ বা পাপকে পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা। যদি পাপ থেকে তওবা করে আবার সে পাপ কাজে লিপ্ত থাকা হয় তবে তা আল্লাহ তাআলার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার শামিল।
যদি পাপ কাজটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অধিকার (হুকুকুল্লাহ) খর্ব করা সংশ্লিষ্ট হয় তবে সেটা ছেড়ে দিতে হবে। আর যদি পাপ কাজটি মানুষের অধিকার (হকুকুল এবাদ) ক্ষুণ্নকারী হয় তবে তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি কোন মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা হয় তবে তা তার মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি কারো সম্মানের হানি করা হয়্তযেমন গিবত বা দোষ-চর্চা করা হল বা গালি দেয়া হল অথবা মিথ্যা অপবাদ দেয়া হল তাহলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বা অন্য কোনভাবে মিটমাট করে দাবি ছাড়িয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করা এমন পাপ যা আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চাইলেও তিনি ক্ষমা করবেন না।
(৪) ‘ভবিষ্যতে কখনো এ পাপে লিপ্ত হব না’্তএমন দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে। যদি আবার উক্ত পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে আবার তওবা করতে হবে।
(৫) তওবা করতে হবে তওবার সময়ের মাঝে। যদি তওবার সময় পার হয়ে যাওয়ার পর তওবা করা হয় তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
এখন প্রশ্ন হল তওবার সময় পার হয়ে যায় কখন ?
তওবার সময় পার হয়ে যাওয়ার দুটি অবস্থা আছে। একটি সাধারণ অবস্থা অন্যটি বিশেষ অবস্থা।
(ক) সাধারণ অবস্থা : যখন কিয়ামতের আলামত হিসেবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। তখন কোন মানুষের তওবা কবুল করা হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :
يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آَيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آَمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا (الأنعام : ১৫৮)
‘যে দিন তোমার প্রতিপালকের কোন নিদর্শন আসবে সেদিন তার ঈমান কোন কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে ঈমান আনে নাই কিংবা ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করে নাই।'[১৮]
এ আয়াতে ‘প্রতিপালকের নিদর্শন’-এর ব্যাখ্যায় রাসূলে কারীম স. যা বলেছেন তা হল সূর্য পশ্চিম দিক দিয়ে উদিত হওয়া। অর্থাৎ যখন সূর্য পশ্চিম দিক দিয়ে উদিত হবে তখন কোন কাফেরের ইসলাম কবুল করা হবে না এবং পাপী ব্যক্তির তওবা গ্রহণ করা হবে না।
(খ) বিশেষ অবস্থা : যখন মৃত্যু উপস্থিত হয়ে যায়। যখন কোন মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয় তখন তওবা করলে তা আল্লাহ গ্রহণ করেন না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿১৭﴾ وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآَنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا ﴿১৮﴾ ( النساء : ১৭-১৮)
‘আল্লাহ অবশ্যই সে সব লোকের তওবা কবুল করবেন যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে এবং সত্বর তওবা করে, এরাইতো তারা যাদ