নারীর প্রাকৃতিক রক্তস্রাব


নারীর প্রাকৃতিক রক্তস্রাব

নারীর প্রাকৃতিক রক্তস্রাব
ভূমিকা
নারী জাতি সাধারণত: তিন প্রকার রক্তস্রাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
যথা:
১) হায়েয মাসিক রক্তস্রাব)।
২) ইস্তেহাযাহ হায়েয ও নেফাসের দিন উত্তীর্ণ হওয়ার পর যে রক্তস্রাব হয়)।
৩) নেফাস সন্তান প্রসবের পরের রক্তস্রাব)।
উপরোক্ত তিন প্রকার রক্তস্রাব এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত যার বিধি-বিধানের বর্ণনা অতীব জরুরী এবং এ প্রসঙ্গে ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মতামতের মধ্যে ভুল-শুদ্ধ পার্থক্য নিরুপন করে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে যা সঠিক ও নির্ভুল তা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। কেননা,
প্রথমতঃ মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ইবাদতের যে সকল হুকুম-আহকাম দিয়েছেন কুরআন ও সুন্নাহই হচ্ছে সেগুলোর মূল ভিত্তি এবং উৎস।
দ্বিতীয়তঃ কুরআন ও হাদীসের উপর পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করে তদনুযায়ী আমল করলে আত্মীক প্রশান্তি, মানসিক স্থিরতা, মনের আনন্দ এবং অল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি অর্জিত হয়।
তৃতীয়তঃ কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুই শরীয়তের আইন-কানুন ও বিধি বিধানের দলীল হতে পারে না। শরীয়তের সমুদয় আইন-কানুন ও হুকুম-আহকামের একমাত্র মানদন্ড হলো কুরআন ও হাদীস। তবে অভিজ্ঞ সাহাবীগণের অভিমতও কোন কোন ক্ষেত্রে দলীল হতে পারে। এর জন্য শর্ত হচ্ছে সাহাবীর অভিমত ও কুরআন-সুন্নাহর মাঝে কোন অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য না থাকা, এমনিভাবে অন্য কোন সাহাবীর সিদ্ধান্তের পরিপন্থীও না হওয়া। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, যদি কখনো কোন সাহাবীর অভিমত এবং কুরআন-হাদীসের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে কুরআন ও সুন্নাহর সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও বরণ করা ওয়াজিব হবে। আর দুই সাহাবীর মত ও সিদ্ধান্তে বৈপরীত্য দেখা দিলে দু’টোর শক্তিশালীটিকেই গ্রহণ করতে হবে। কেননা পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেন:
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً ৫৯) سورة النساء
“যদি তোমরা পরস্পর কোন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড় তাহলে সেটিকে আেল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পিত কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম।” [সূরা আন-নিসা: ৫৯]
এই পুস্তিকাখানা নারী জাতির উপরোক্ত তিন প্রকার রক্তস্রাব ও তার হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর উপর সংক্ষিপ্তাকারে রচিত এবং সাত পরিচ্ছেদে বিভক্ত।
পরিচ্ছেদগুলো হচ্ছে:
১ম পরিচ্ছেদ: হায়েযের অর্থ ও তা সৃষ্টির রহস্য।
২য় পরিচ্ছেদ: হায়েযের বয়স এবং সময়-সীমা।
৩য় পরিচ্ছেদ: হায়েয সংক্রান্ত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী।
৪র্থ পরিচ্ছেদ: হায়েযের বিধি-বিধান।
৫ম পরিচ্ছেদ: ইস্তেহাযাহ ও তার হুকুম।
৬ষ্ট পরিচ্ছেদ: নেফাস ও তার হুকুম।
৭ম পরিচ্ছেদ: হায়েয প্রতিরোধক কিংবা সঞ্চালক এবং
জন্মনিয়ন্ত্রণকারী কিংবা গর্ভপাতকারী ঔষধ ব্যবহারের বিধান।

প্রথম পরিচ্ছেদ
হায়েযের অর্থ ও তা সৃষ্টির রহস্য
হায়েযের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোন বস্তু নির্গত ও প্রবাহিত হওয়া।
আর শরীয়তের পরিভাষায় হায়েয বলা হয় ঐ প্রাকৃতিক রক্তকে, যা বাহ্যিক কোন কার্যকারণ ব্যতীতই নির্দিষ্ট সময়ে নারীর যৌনাঙ্গ দিয়ে নির্গত হয়।
হায়েয প্রাকৃতিক রক্ত। অসুস্থতা, আঘাত পাওয়া, পড়ে যাওয়া এবং প্রসবের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এই প্রাকৃতিক রক্ত নারীর অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির বিভিন্নতার কারণে নানা রকম হয়ে থাকে এবং এ কারণেই ঋতুস্রাবের দিক থেকে নারীদের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।
বিস্ময়কর তাৎপর্য :
পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রতিটি মানুষ ও প্রাণী আহার্য্য সংগ্রহ করে থাকে, বিভিন্ন রকম খাদ্যদ্রব্য খেয়ে জীবন যাপন করে, কিন্তু নারীর গর্ভে অবস্থানরত বাচ্চার পক্ষে সে ধরনের খাদ্য বা আহার্য্য গ্রহণ করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয় এবং কোন দয়াপরবশ মানুষের পক্ষেও গর্ভস্থ বাচ্চার নিকট খাদ্য সরবরাহ করা অসম্ভব। ঠিক এমনি মুহূর্তে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা নারী জাতির মাঝে রক্ত প্রবাহের এমন এক আশ্চর্য ধারা স্থাপন করেছেন, যার দ্বারা মায়ের গর্ভে অবস্থানরত বাচ্চা মুখ দিয়ে খাওয়া এবং হজম করা ছাড়াই আহার্য্য গ্রহণ করতে পারে। উক্ত রক্ত নাভির রাস্তা দিয়ে বাচ্চার শরীরে প্রবাহিত হয়ে শিরাসমূহে অনুপ্রবেশ করে এবং বাচ্চা এর মাধ্যমে আহার্য্য গ্রহণ করে। নিপুনতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময় ও মহান। এটাই হায়েয সৃষ্টির মূল রহস্য এবং এ কারণেই যখন কোন নারী গর্ভবতী হয় তখন তার হায়েয বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কদাচিৎ এর ব্যতিক্রমও হয়। যা বিবেচনার মধ্যে পড়ে না। তেমনিভাবে খুব কম সংখ্যক প্রসূতির হায়েয হয়ে থাকে, বিশেষ করে প্রসবের প্রাথমিক অবস্থায়।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
রক্তস্রাবের বয়স ও তার সময়-সীমা
এই অধ্যায়ে আলোচ্য বিষয় দু’টি:
১) নারীদের রক্তস্রাব কত বছর বয়স থেকে শুরু হয় এবং কত বছর বয়স পর্যন্ত চালু থাকে।
২) রক্তস্রাবের সময়-সীমা।
প্রথম বিষয়: সাধারণত ১২ বছর বয়স থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত নারীদের রক্তস্রাব হয়ে থাকে। তবে কখনো কখনো অবস্থা, আবহাওয়া এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে উপরোল্লেখিত বয়সের পূর্বে এবং পরেও রক্তস্রাব হতে পারে।
ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন যে, রক্তস্রাব হওয়ার জন্য নারীদের বয়সের এমন কোন নির্দিষ্ট সীমা-রেখা আছে কি না, যার আগে বা পরে রক্তস্রাব হয় না। আর যদিও বা হয় তাহলে সেটা অসুস্থতা হিসেবে পরিগণিত হবে, না রক্তস্রাব হিসেবে?
এ প্রসঙ্গে ইমাম দারমী রাহিমাহুল্লাহ সকল মতামতগুলো উল্লেখ করে বলেছেন যে, ‘আমার নিকট এর কোনটিই ঠিক নয়। কেননা রক্তস্রাবের জন্য বয়স নির্দিষ্ট করা বা বয়সের সীমা-রেখা নির্ণয় করা নির্ভর করে রক্তস্রাব দেখা দেয়ার উপর। সুতরাং যে কোন বয়স এবং যে কোন সময়ে নারীদের যৌনাঙ্গে কোন প্রকার রক্ত দেখা দিলে সেটাকে রক্তস্রাব বা হায়েয হিসেবে গণ্য করা ওয়াজেব।’ আল্লাহ তা’আলাই সর্বজ্ঞ। [আল-মাজমূ’ শারহুল মুহায্‌যাব: ১/৩৮৬]
আমার দৃষ্টিতে ইমাম দারমীর এই অভিমতটি সঠিক বলে মনে হচ্ছে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহও এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। অতএব নারী যখনই তার যৌনাঙ্গে রক্ত দেখতে পাবে তখনই সে ঋতুবতী হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। যদিও সে রক্ত নয় বছর বয়সের পূর্বে কিংবা পঞ্চাশ বছর বয়সের পরে দেখা দেয়। কেননা হায়েযের সমুদয় হুকুম-আহকামকে মহান আল্লাহ ও রাসূলে করীম ৎ রক্ত দেখা দেয়ার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন এবং এর জন্য বয়সের কোন নির্দিষ্ট সময়-সীমা নির্ধারণ করেননি। সুতরাং যে রক্তস্রাবকে হুকুম-আহকামের সাথে সম্পৃক্ত করে রাখা হয়েছে সেটা দেখা দিলেই তার নির্ধারিত বিধান) পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, ঋতুস্রাবকে কোন নির্দিষ্ট বয়সের সাথে সম্পৃক্ত করতে হলে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক কোন একটি দলীলের নিশ্চয়ই প্রয়োজন রয়েছে, অথচ এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কোনই প্রমাণ নেই।
দ্বিতীয় বিষয়: ঋতুস্রাবের সময়-সীমা অর্থাৎ ঋতুস্রাব কতদিন থাকতে পারে। এ ব্যাপারেও ওলামায়ে কেরামের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে, এমনকি এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের ছয় অথবা সাতটি অভিমত পাওয়া যায়। ইবনুল মুনযির এবং ফিকহবিদগণের একটি দল বলেছেন যে, হায়েয কমপক্ষে এবং বেশীর পক্ষে কতদিন থাকতে পারে এর কোন নির্দিষ্ট সীমা-রেখা নেই। আমার অভিমত ইমাম দারমীর উপরোল্লিখিত অভিমতের মতই যা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহও গ্রহণ করেছেন। এবং এটিই সঠিক, কেননা কুরআন, সুন্নাহ ও কিয়াস দ্বারা তাই প্রমাণিত হয়।
১ম দলীল: আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে ইরশাদ করেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلاَ تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىَ يَطْهُرْنَ ২২২) سورة البقرة
“তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তুমি বলে দাও, এটা কষ্টদায়ক বস্তু, কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাক এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকট যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২২২]
উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করাকে স্ত্রী সঙ্গমের নিষেধাজ্ঞার শেষ সীমা নির্ধারণ করেছেন। এক দিন, এক রাত, তিন দিন, তিন রাত অথবা পনের দিন পনের রাতকে নিষেধাজ্ঞার শেষ সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেননি। এ থেকে বুঝা যায় যে, ঋতুস্রাব দেখা দেয়া না দেয়ার উপরই তার হুকুম-আহকামের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ যখনই ঋতুস্রাব দেখা দিবে তখনই তার বিধি-বিধান কার্যকরী হবে এবং যখনই বন্ধ হবে বা পবিত্রতা অর্জন করবে তখনই বিধি-বিধানের কার্যকরিতা শেষ হয়ে যাবে। বুঝা গেল, ঋতুস্রাব কতদিন থাকতে পারে এর সর্বোচ্চ এবং সর্ব নিম্ন কোন সীমা নির্দিষ্ট নেই।
দ্বিতীয় দলীল: সহীহ মুসলিমে এসেছেأنّ
উমরার ইহম অবস্থায় আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার যখন রক্তস্রাব দেখা দিয়েছিল, তখন রাসূলে করীম সা. তাঁকে বলেছিলেন: তুমি ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কা’বা শরীফের তওয়াফ ছাড়া উমরার অন্যান্য কাজগুলো করে যাও, যেভাবে হাজীরা করে যাচ্ছে।)) অর্থাৎ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হলে তখন তওয়াফ করবে) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: যখন কুরবানীর দিন আসলো তখন আমি পবিত্র হলাম। [ম ৪/৩০] সহীহ বুখারীর তৃতীয় খন্ডের ৬১০ পৃষ্ঠায় উক্ত হাদীস এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
أنَّ النَّبِيَّ ৎ قَالَ: ্থ্থانْتَظِرِيْ فَإذَا طَهُرْتِ فَاخْرُجِيْ إلَى التَّنْعِيْمِ
অর্থাৎ নবী করীম সা. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেন: তুমি পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর, পবিত্রতা অর্জন করার পর উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে এহরাম বাঁধার জন্য) তান’য়ীমের দিকে বের হও।))
তান’য়ীম হারামের বাইরে মক্কা মুকাররামার উত্তর পাশে নিকটবর্তী একটি স্থান। নবী করীম সা. এখানেও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেননি। এথেকে প্রতীয়মান হয় যে, রক্তস্রাব দেখা দেয়া না দেয়ার সাথেই তার হুকুম-আহকামের সম্পর্ক। নির্দিষ্ট কোন সময়ের সাথে নয়।
তৃতীয় দলীল: ফিকহবিদগণের হায়েয সংক্রান্ত এসব বিস্তারিত আলোচনা ও অনুমান-ধারণা কুরআন ও সুন্নাহতে বিদ্যমান না থাকা সত্বেও প্রয়োজনের খাতিরে বর্ণনা করা জরুরী। যদি এ সমস্ত আলোচনাকে হৃদয়ঙ্গম করা এবং এগুলোর দ্বারা আল্লাহ তা’আলার উপাসনা করা বান্দার জন্য অত্যাবশ্যকীয় হয়ে থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং রাসূলে করীম সা. প্রত্যেকের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতেন। কেননা এগুলোর সাথে নারীর নামায, রোযা, বিবাহ, তালাক এবং মীরাসের মাসআলা মাসায়েল সম্পৃক্ত। যেমনিভাবে আল্লাহ তা’আলা ও রাসূল সা. নামাযের সংখ্যা, নামায পড়ার নির্দিষ্ট সময়, নামাযের রুকূ’, সেজদাহ, যাকাতের মাল, মালের নিসাব ও পরিমাণ, যাকাত বিতরণ করার নির্দিষ্ট স্থান, রোযার সময়-সীমা এবং হজ্জসহ অন্যান্য বিষয়াবলী স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। এমনকি খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম-নীতি, ঘুমের আদব, স্ত্রী সহবাস, উঠা-বসা, গৃহে প্রবেশ, গৃহ থেকে বের হওয়া, পায়খানা ও প্রস্রাবের নিয়ম-নীতিও বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয় বরং পায়খানা ও প্রস্রাব করার ব্যবহৃত ঢিলার সংখ্যা নির্ধারণ করাসহ জটিল ও সূক্ষ্ণ বিষয়াদির বিবরণও বিশ্ব মানবের সামনে তুলে ধরেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা তাঁর মনোনীত ধর্মকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং মু’মিন বান্দাদের উপর নিজের নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সূরা নাহ্‌লের ৮৯ নম্বর আয়াতে নবী করীম ৎ-কে সম্মোধন করে এরশাদ করেন:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ ৮৯) سورة النحل
“আমি প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়ে তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছি।” [সূরা আন-নাহ্‌ল: ৮৯]
এমনিভাবে কুরআন শরীফে সূরা ইউসুফের ১১১ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে তিনি আরো ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ১১১) سورة يوسف
“এটা কোন মনগড়া কথা নয়, বরং বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্য পূর্ববর্তী গ্রন্থের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ।” [সূরা ইউসুফ: ১১১]
এখন বুঝতে হবে যেহেতু এ সবের বিস্তারিত আলোচনা কুরআন ও হাদীসে নেই সেহেতু এ সবের উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ারও প্রয়োজন নেই। নির্ভরতার প্রয়োজন শুধু হায়েয দেখা দেয়া না দেয়ার উপর। কুরআন ও সুন্নাহতে এ সমস্ত বিষয়াদি না থাকাটাই প্রমাণ করে যে, এগুলোর কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই। হায়েয ঋতুস্রাব) সম্পর্কীয় মাসআলা সহ অন্যান্য সকল মাসআলাসমূহে কুরআন ও সুন্নাহই আপনাকে সাহায্য করবে। কেননা শরীয়তের সকল বিধি-বিধান কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ অথবা বিশুদ্ধ কিয়াস দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে, অন্য কোন কিছুর মাধ্যমে নয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া একটি নীতিমালা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন: ‘কুরআন ও সুন্নাহতে আল্লাহ তা’আলা রক্তস্রাবের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু হুকুম-আহকাম বর্ণনা করেছেন, কিন্তু রক্তস্রাব কতদিন থাকতে পারে, এর সর্ব নিম্ন ও সর্বোচ্চ সময়-সীমা কি, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেন নি। এমনকি বান্দার জন্য অত্যাধিক প্রয়োজনীয় এবং জটিল বিষয় হওয়া সত্বেও আল্লাহ তা’য়ালা দুই পবিত্রতার মধ্যবর্তী সময়ের সীমা-রেখা নির্দিষ্ট করেননি। আরবী অভিধানও এর কোন সময়-সূচী নির্ধারণ করেনি। সুতরাং হায়েয বা রক্তস্রাবের জন্য যে ব্যক্তি কোন সময়-সীমা নির্দিষ্ট করবে সে সরাসরি কুরআন ও হাদীসের বিরুদ্ধাচরণ করবে।’
চতুর্থ দলীল: যা বিশুদ্ধ কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তা’আলা রক্তস্রাবকে ময়লা বস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছেন, কাজেই যখনই রক্তস্রাব দেখা দিবে তখনই সেটাকে ময়লা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে রক্তস্রাবের প্রথম এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ, ১৫তম এবং ১৬তম ও ১৭তম এবং ১৮তম দিনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ময়লা ময়লাই। সুতরাং ময়লা যেহেতু উভয় দিনেই বিদ্যমান সেহেতু উক্ত দুই দিনের মধ্যে হুকুমের দিক থেকে পার্থক্য করা কিভাবে সঠিক হতে পারে? এটা কি বিশুদ্ধ কিয়াসের পরিপন্থী নয়? বিশুদ্ধ কিয়াস কি উভয় দিনকে হুকুমের দিক থেকে সমান গণ্য করে না?
পঞ্চম দলীল: রক্তস্রাবের জন্য সময়-সীমা নির্ধারণকারীদের পারস্পরিক মতভেদ ও সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। এবং এ ধরনের পারস্পরিক মতভেদই প্রমাণ করে যে, এ বিষয়ে এমন কোন সমাধান নেই, যেটাকে গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয়। তা ছাড়া এ সকল মতামত হচ্ছে ইজতেহাদী যা ভুল-শুদ্ধ দ’ুটোরই সম্ভাবনা রাখে। এমতাবস্থায় সমাধান ও সঠিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য কুরআন ও সুন্নাতের দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে।
উপরোল্লিখিত আলোচনা দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ঋতুস্রাবের সর্ব নিম্ন এবং সর্বোচ্চ কোন সময়-সীমা নির্দিষ্ট নেই, এবং এটিই গ্রহণযোগ্য। সুতরাং নারীর লজ্জাস্থানে রক্ত দেখা দিলে -যা আঘাত বা অন্য কোন কারণে প্রবাহিত হয়নি- ধরে নিতে হবে যে এটি হায়েযের রক্ত হিসেবেই প্রবাহিত হচ্ছে এবং এর জন্য কোন বয়স ও সময় নির্দিষ্ট নেই। তবে হ্যাঁ, এ রক্ত যদি বিরতিহীনভাবে প্রবাহিত হতে থাকে যে, আর বন্ধই হচ্ছে না অথবা অত্যন্ত স্বল্প সময় যেমন মাসে মাত্র এক-দুই দিন প্রবাহিত হয়ে থাকে তাহলে সেটাকে ইস্তেহাযাহ্‌ হিসেবে গণ্য করতে হবে যার বিস্তারিত বিবরণ শীঘ্রই সম্মানিত পাঠকবৃন্দের সামনে আসছে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ হায়েয সম্পর্কে বলেন: ‘নারীদের রেহেম গর্ভাশয়) থেকে যা কিছু বের হবে তাই হায়েয বলেই গণ্য হবে যতক্ষণ না ইস্তেহাযার রক্ত হিসেবে অকাট্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়।’ তিনি আরো বলেন: ‘নারীর লজ্জাস্থান থেকে যখন কোন প্রকার রক্ত বের হবে তখন যদি জানা না থাকে যে, এটা কি রগ থেকে বের হয়ে আসা রক্ত না কোন আঘাত জনিত কারণে প্রবাহিত রক্ত, তাহলে সে রক্তকে হায়েয হিসেবেই গণ্য করতে হবে।’ শায়খুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহর এই অভিমত সময়-সীমা নির্ধারণকারীদের অভিমতের চেয়ে দলীল-প্রমাণের দিক থেকে যেমন শক্তিশালী, ঠিক তেমনই অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করার পক্ষে এবং আমল ও বাস্তবায়নের দিক দিয়েও অতি সহজ। এমনকি উক্ত গুণাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে কোন মতকে দ্বীন ও ইসলামের সার্বজনীন নীতির প্রতি লক্ষ্য রেখে গ্রহণ করাই উত্তম। কেননা এটা সহজসাধ্য ও সরল। যেন তা পালন করা কারো পক্ষে কষ্টকর না হয়।)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ৭৮) سورة الحـج
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নি।” [সূরা আল-হাজ্জ: ৭৮]
এবং নবী করীম সা. এরশাদ করেছেন:
্থ্থإنَّ الدِّيْنَ يُسْرٌ, وَلَنْ يُشَادَّ الدِّيْنَ أحَدٌ إلاَّ غَلَبَهُ, فَسَدِّدُوْا وَقَارِبُوْا وَأبْشِرُوْا,,
নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। কেউ দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করে জিততে পারে না। কাজেই তোমরা মধ্য পথ অবলম্বন কর, দ্বীনের) নিকটবর্তী থাক এবং অল্প কিন্তু স্থিতিশীল আমলের প্রতিদানের) সুসংবাদ দাও।)) [বুখারী]
নবী করীম সা.-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, যতক্ষণ পর্যন্ত গুনাহ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কোন বিষয়ের দুটি দিকের মধ্যে সহজ দিকটাই তিনি গ্রহণ করতেন।
গর্ভবতী মহিলার রক্তস্রাব
সাধারণত নারী যখন গর্ভবতী হয় তখন রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘রক্তস্রাব বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে গর্ভবতী বলে প্রমাণিত হয়। সন্তান সম্ভবা মহিলা যদি প্রসবের অল্প সময় পূর্বে যেমন দুই দিন অথবা তিন দিন পর্যন্ত রক্তস্রাব দেখে এবং সাথে যদি প্রসব বেদনা থাকে তাহলে উহাকে নেফাস প্রসবোত্তর রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য করা হবে। আর যদি প্রসবের অনেক পূর্বে রক্ত প্রবাহিত হয়ে থাকে তাহলে উক্ত রক্ত নেফাস হিসেবে গণ্য হবে না। এমতাবস্থায় প্রবাহিত রক্তকে কি হায়েয হিসেবে গণ্য করে তার উপর হায়েযের বিধি-বিধান কার্যকরী করা হবে? না অসুস্থতার রক্ত গণ্য করা হবে? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক সমাধান হচ্ছে, সন্তান সম্ভবা মহিলার যদি পূর্বের অভ্যাস অনুযায়ী রক্ত দেখা দেয় তাহলে সেটাকে হায়েয হিসেবে গণ্য করতে হবে। কেননা নারীর লজ্জাস্থান থেকে যে রক্ত বের হয় তা হায়েয হওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত নিয়ম। হ্যাঁ, উক্ত রক্ত হায়েয নয় এর পিছনে যদি কোন রকম শক্ত প্রমাণ থাকে তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাতের কোথাও এমন কোন প্রমাণ নেই যে, গর্ভবতী মহিলার হায়েয হতে পারে না। ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমাল্লাহর এটিই মত। ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহও এই মত গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর লিখিত ইখতিয়ারাত গ্রন্থের ৩০ পৃষ্ঠায় ইমাম বাইহাকীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, ইমাম আহমদের এই জাতীয় একটি অভিমত রয়েছে। বরং তিনি উল্লেখ করেছেন ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমাল্লাহর উক্ত মতামতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এখন প্রতীয়মান হলো যে, সাধারণ মহিলার হায়েযের যে হুকুম গর্ভবতী মহিলারও ঠিক সেই হুকুম। তবে নিম্নোক্ত দু’টি মাসআলায় এর ব্যতিক্রম রয়েছে:
১) তালাক: অন্তঃসত্তা নয় এমন মহিলার ঋতুস্রাবের অবস্থায় ইদ্দত পূরণ করা হলে তাকে তালাক দেয়া হারাম।পক্ষান্তরে সন্তান সম্ভবা মহিলার ঋতুস্রাবের অবস্থায় ইদ্দত পূরণ করা জরুরী হলেও তাকে তালাক দেয়া হারাম নয়। কেননা কুরআন মজীদে বলা হয়েছে যে,
فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ ১) سورة الطلاق
“তোমরা তাদেরকে তালাক দিও তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে।” [সূরা আত-তালাক: ১]
সন্তান সম্ভবা নয় এমন মহিলাকে রক্তস্রাবের অবস্থায় তালাক দেয়া কুরআন শরীফের উক্ত আয়াতের বিরোধী। কিন্তু সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে হায়েযের অবস্থায় তালাক দেয়া কুরআন শরীফের ঘোষণা বিরোধী নয়। কেননা যে ব্যক্তি গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিবে সে তো তার ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখেই দিবে, স্ত্রী হায়েযের অবস্থায় থাকুক বা পবিত্র অবস্থায় থাকুক। কারণ গর্ভধারণ দিয়েই তার ইদ্দত পরিগণিত হবে। আর এ কারণেই সঙ্গমের পরে তাকে তালাক দেয়া হারাম নয় বরং জায়েয। পক্ষান্তরে গর্ভবতী নয় এমন মহিলাকে সঙ্গমের পর তালাক দেওয়া হারাম।
২) গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে নারীর ঋতুবতী হওয়া না হওয়া সমান। প্রমাণ হিসেবে পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা তালাকের ৪নং আয়াত পেশ করা হচ্ছে। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন:
وَأُوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ৪) سورة الطلاق
“গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত।” [সূরা আত-তালাক: ৪]
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
হায়েয অবস্থায় আপতিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হায়েয অবস্থায় আপতিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি কয়েক প্রকার:
১ম বিষয়: রক্তস্রাব নির্দিষ্ট নিয়ম ও পরিমাণের চেয়ে কম অথবা বেশী হওয়া। যেমন কোন নারীর প্রতি মাসে ছয় দিন করে ঋতুস্রাবের অভ্যাস। ছিল কিন্তু এক মাসে ৭ দিন পর্যন্ত ঋতুস্রাব অব্যাহত থাকে অথবা কোন মেয়েলোকের ৭ দিন করে ঋতুস্রাব হয়ে থাকে সেখানে ৬ দিন থাকার পর বন্ধ হয়ে গেল।
২য় বিষয়: নিয়মিত অভ্যাসের আগে-পরে হায়েয আরম্ভ হওয়া। যেমন যেখানে মাসের শেষের দিকে হায়েয আসে সেখানে প্রথম দিকে আসলো অথবা মাসের প্রথম দিকে আসার পরিবর্তে শেষের দিকে আসলো।
উপরোক্ত বিষয় দু’টির হুকুম কি? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক সমাধান হচ্ছে এই যে, নারী যখনই ঋতুস্রাব দেখতে পাবে তখনই ঋতুবতী হিসেবে গণ্য হবে এবং যখনই তা বন্ধ হবে তখনই পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে পূর্ব অভ্যাসের চেয়ে কম-বেশী হওয়া কিংবা আগে-পরে হওয়া সমান কথা। এ মাসআলার প্রমাণাদি পূর্বের অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
সার-সংক্ষেপ হল, রক্তস্রাব দেখা দেয়া না দেয়ার উপরই তার হুকুম-আহকাম নির্ভর করে। এটিই ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর অভিমত। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহও এ সমাধানকে গ্রহণ করেছেন। মুগনী গ্রন্থের লেখক উক্ত অভিমতের সমর্থন করে বলেছেন, ‘উপরোল্লিখিত অবস্থায় যদি নারীদের নিয়মিত বা পূর্ব অভ্যাস ধর্তব্য হতো তাহলে নিশ্চয় নবী করীম ৎ নিজ উম্মতের কাছে তা বর্ণনা করতেন, বিলম্ব করার কোন প্রশ্নই উঠে না। কারণ নবী করীম ৎ-এর পবিত্র স্ত্রীগণ সহ সকল নারীজাতির জন্য মাসআলাটির বিবরণ সার্বক্ষনিক প্রয়োজনীয় ছিল, তাই তাতে বিলম্ব করা জায়েয ছিলনা। সুতরাং মুহাম্মাদ ৎ এ ব্যাপারে অসতর্ক ছিলেন না, বরং সতর্কই ছিলেন। সুতরাং মুস্তাহাযাহ্‌ নারী ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে পূর্ব অভ্যাস ধর্তব্য বলে প্রিয় নবী ৎ থেকে কোন আলোচনার সূত্রপাত হয়নি।’ [মুগনী: ১/৩৫৩]
তৃতীয় বিষয়: হলুদ অথবা মাটি বর্ণের রক্ত প্রসঙ্গ:
কোন মহিলা যদি তার লজ্জাস্থানে জখমের পানির মত হলুদ বর্ণের অথবা হলুদ এবং কাল রং এর মধ্যবর্তী বর্ণের রক্ত দেখে তাহলে সে রক্ত ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে অথবা ঋতুস্রাবের পর পরই পবিত্র হওয়ার পূর্বেই প্রবাহিত হলে ঋতুস্রাব বলে গণ্য হবে এবং এর উপর ঋতুস্রাবের বিধি-বিধান কার্যকরী হবে। পক্ষান্তরে যদি সে রক্ত পবিত্রতা অর্জনের পরে প্রবাহিত হয়ে থাকে তাহলে সেটা ঋতুস্রাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা উম্মে আতিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা এ প্রসঙ্গে বলেছেন:
্থ্থكُنَّا لاَ نَعُدُّ الصُّفْرَةَ وَالْكُدْرَةَ بَعْدَ الطُّهْرِ شَيْئًا
আমরা পবিত্রতা অর্জন করার পর হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্তকে কিছুই মনে করতাম না।)) [হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ বিশুদ্ধ সনদ দ্বারা উল্লেখ করেছেন। এবং ইমাম বুখারীও বর্ণনা করেছেন তবে ‘পবিত্রতা অর্জন করার পর’ কথাটি তিনি উল্লেখ না করলেও শিরোনাম দাঁড় করিয়েছেন এভাবে {রক্তস্রাব বিহীন দিনগুলিতে হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্ত প্রবাহিত হওয়া অধ্যায়}।] বুখারী শরীফের র্শা‌হ ব্যাখ্যা) ফত্‌হুল বারীতে বলা হয়েছে যে, এই শিরোনাম দ্বারা ইমাম বুখারী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীস ্থلاَ تَعْجَلْنَ حَتَّى تَرَيْنَ الْقَصَّةَ الْبَيْضَاء অর্থাৎ সাদা পানি না দেখা পর্যন্ত তাড়াহুড়া করো না।)) এবং উম্মে আতিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহার উপরোল্লিখিত হাদীসের মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করতে চেয়েছেন যে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার উদ্দেশ্য হচ্ছে ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে যদি হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্ত দেখে তাহলে সেটা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে। এবং উম্মে আতিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীসের অর্থ হচ্ছে যে, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে পবিত্রতা অর্জন করার পর হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্ত দেখা দিলে তা ধর্তব্য নয়।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু