নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের ভূমিকা


ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহীসম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়াভূমিকা:নারী ও পুরুষ অখণ্ড মানব সমাজের দু’টি অপরিহার্যঅঙ্গ। পুরুষ মানব সমাজের একটি অংশের প্রতিনিধিত্বকরলে আরেকটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী।নারীকে উপেক্ষা করে মানবতার জন্য যেকর্মসূচী তৈরী হবে তা হবে অসম্পূর্ণ। আমরাএমন কোনো সমাজের কথা কল্পনাই করতে পারিনা যা কেবল পুরুষ নিয়ে গঠিত, যেখানে নারীরপ্রয়োজন অনুভূত হয় না। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটিসমাজেই নারী ও পুরুষ সমানভাবে পরস্পরেরমুখাপেক্ষী। তাই এর কোনোটাকে বাদ দিয়েমানব সমাজ কোনক্রমেই পূর্ণত্ব অর্জন করতেপারে না। এ কারণেই নারী-পুরুষের সুষম উন্নয়নসমাজ প্রগতির একটি অনিবার্য পূর্বশর্ত। নারীসুদীর্ঘকাল ধরে নানাভাবে নিপীড়িত ও নিষ্পেষিতহয়েছে এবং আজকের সভ্য সমাজেও হচ্ছে।ইসলাম একেবারে শুরু থেকেই সর্বতোভাবেনারী-নির্যাতনের বিপক্ষে সোচ্চার। তারপরওমুসলিম অধ্যুষিত আমাদের এ জনপদে নারীরানিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত কেন তা রীতিমতবিস্ময়কর। সম্ভবত নারী নির্যাতন রোধে ইসলামযে কর্মসূচী ও কর্মপন্থা দিয়েছে তাভালোভাবে অনুধাবন এবং অনুসরণ না করাই এরসবচেয়ে বড় কারণ। আজকের আলোচনায়ইসলামী সমাজে নারীর অবস্থান নির্ধারণ করেনারী কীভাবে নির্যাতিত হয় এবং এর প্রতিকারেইসলাম কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা আমরা তুলে ধরব।ইসলামের দৃষ্টিতে নারী:সমাজে নারীর অবস্থান যখন ছিল অমানবিক এবং অতিকরুণ তখন থেকেই ইসলাম নারীর অধিকার ও মর্যাদাউন্নয়নের জন্য নজীরবিহীন পদক্ষেপনিয়েছে। সে সকল পদক্ষেপের মধ্যেউল্লেখযোগ্য হল:(ক) নারী সম্মানিত সৃষ্টি: ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষঅতীব সম্মানিত ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।ইসলাম জন্মগতভাবে মানুষকে এ মর্যাদা দিয়েছে।মহান আল্লাহ বলেন,﴿۞ﻭَﻟَﻘَﺪۡ ﻛَﺮَّﻣۡﻨَﺎ ﺑَﻨِﻲٓ ﺀَﺍﺩَﻡَ ﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٧٠‏]‘‘আর নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদেরকে সম্মানিতকরেছি’’। [সূরা আল-ইসরা/বনী ইসরাইল: ৭০]বস্তুত মানুষ সম্পর্কে ইসলামের এ ঘোষণা পুরুষও নারী উভয়ের জন্যই সমানভাবে শাশ্বত ওচিরন্তন। মানবিক সম্মান ও মর্যাদার বিচারে নারী ওপুরুষের মাঝে কোনই পার্থক্য নেই। নারীকেশুধু নারী হয়ে জন্মাবার কারণে পুরুষের তুলনায়হীন ও নীচ মনে করা সম্পূর্ণ জাহেলী ধ্যান-ধারণা, এরূপ চিন্তাভাবনা ইসলাম স্বীকার করে না।অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে নারী হচ্ছে মহান স্রষ্টাআল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি।(খ) ঈমান ও আমলই নারী-পুরুষের মর্যাদানির্ণয়ের সঠিক মাপকাঠি:ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতা সুস্থচিন্তা ও সঠিক কর্মের সাথে সম্পৃক্ত। যে আদর্শও মতবাদ নারীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে নীচুও লাঞ্ছনার যোগ্য মনে করে, মানবতার উচ্চ আসনথেকে দূরে নিক্ষেপ করে এবং পুরুষকে শুধুপুরুষ হওয়ার কারণে উচ্চতর আসনের উপযুক্তমনে করে, ইসলাম তাকে জাহেলিয়াত বলেআখ্যায়িত করেছে। ইসলাম পরিস্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাষায় ঘোষণা করেছে যে, মর্যাদা লাঞ্ছনা এবংমহত্ত্ব ও নীচতার মাপকাঠি হলো তাকওয়া-পরহেযগারী এবং চরিত্র ও নৈতিকতা। এ মাপকাঠিতেযে যতটা খাঁটি প্রমাণিত হবে মহান আল্লাহর কাছেসে ততটাই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবে।আল্লাহ বলেন,﴿ﻣَﻦۡ ﻋَﻤِﻞَ ﺻَٰﻠِﺤٗﺎ ﻣِّﻦ ﺫَﻛَﺮٍ ﺃَﻭۡ ﺃُﻧﺜَﻰٰ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﺆۡﻣِﻦٞ ﻓَﻠَﻨُﺤۡﻴِﻴَﻨَّﻪُۥﺣَﻴَﻮٰﺓٗ ﻃَﻴِّﺒَﺔٗۖ ﻭَﻟَﻨَﺠۡﺰِﻳَﻨَّﻬُﻢۡ ﺃَﺟۡﺮَﻫُﻢ ﺑِﺄَﺣۡﺴَﻦِ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮﺍْ ﻳَﻌۡﻤَﻠُﻮﻥَ٩٧ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺤﻞ : ٩٧‏]‘‘পুরুষ বা নারীর মধ্য থেকে যে-ই ভালো কাজকরলো সে ঈমানদার হলে আমি তাকে একটি পবিত্রজীবন যাপন করার সুযোগ দেব এবং তারা যে কাজকরছিল আমি তাদেরকে তার উত্তর পারিশ্রমিক দানকরব।’’ [ সূরা আন-নাহল: ৯৭]আল্লাহ আরো বলেন,﴿ﻓَﭑﺳۡﺘَﺠَﺎﺏَ ﻟَﻬُﻢۡ ﺭَﺑُّﻬُﻢۡ ﺃَﻧِّﻲ ﻟَﺂ ﺃُﺿِﻴﻊُ ﻋَﻤَﻞَ ﻋَٰﻤِﻞٖ ﻣِّﻨﻜُﻢ ﻣِّﻦﺫَﻛَﺮٍ ﺃَﻭۡ ﺃُﻧﺜَﻰٰۖ ﴾ ‏[ ﺍﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ : ١٩٥‏]‘‘তাদের রব তাদের দো‘আ কবুল করলেন এমর্মে যে, পুরুষ হোক বা নারী হোকতোমাদের কোনো আমলকারীর আমল আমিনষ্ট করব না।’’ [সূরা আলে-ইমরান: ১৯৫]অর্থাৎ মানব জাতির দু’টো শাখার মধ্য হতে যে-ইকর্মের পবিত্রতার দ্বারা তারা আমলনামা উজ্জ্বলকরবে, আল্লাহর কাছে মর্যাদা ও সফলতার প্রাপ্তিঘটবে তারই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বহু নারীঈমান ও আমলে বহু পুরুষকে ছাড়িয়ে গেলেনিঃসন্দেহে তারা সে সব পুরুষের চেয়ে মর্যাদাবানবিবেচিত হবেন।(গ) নারী ও পুরুষ উভয়ই সভ্যতার নির্মাতা:আল-কুরআন আল-কারীমের বক্তব্য থেকে একথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, জীবনেরসবরকমের তৎপরতা ও উত্থান-পতনের ক্ষেত্রেসর্বদাই নারী ও পুরুষ পরস্পরকে সহযোগিতাকরেছে। উভয়ে মিলে জীবনের কঠিন ভার বহনকরেছে এবং উভয়ের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সভ্যতাও তামাদ্দুনের ক্রমবিকাশ ঘটেছে। আল্লাহ বলেন,﴿ﻭَﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨُﻮﻥَ ﻭَﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖُ ﺑَﻌۡﻀُﻬُﻢۡ ﺃَﻭۡﻟِﻴَﺂﺀُ ﺑَﻌۡﺾٖۚ ﻳَﺄۡﻣُﺮُﻭﻥَﺑِﭑﻟۡﻤَﻌۡﺮُﻭﻑِ ﻭَﻳَﻨۡﻬَﻮۡﻥَ ﻋَﻦِ ﭐﻟۡﻤُﻨﻜَﺮِ ﻭَﻳُﻘِﻴﻤُﻮﻥَ ﭐﻟﺼَّﻠَﻮٰﺓَ ﻭَﻳُﺆۡﺗُﻮﻥَﭐﻟﺰَّﻛَﻮٰﺓَ ﻭَﻳُﻄِﻴﻌُﻮﻥَ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟَﻪُۥٓۚ﴾ ‏[ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ : 71‏]‘‘আর মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারী একে অপরেরবন্ধু। তারা ভাল কাজের আদেশ দেয়, মন্দ কাজথেকে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাতদেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকরে।’’ [সূরা আত-তাওবাহ: ৭১](ঘ) নারী সম্পর্কে ভুল দৃষ্টিভঙ্গির অপনোদন:ইসলাম আগমনের পূর্বে গোটা দুনিয়া নারীজাতিকে একটি অকল্যাণকর তথা সভ্যতা ও তামাদ্দুনেরজন্য অপ্রয়োজনীয় উপাদান মনে করেকর্মক্ষেত্র থেকে অপসারিত করেছিল। তাকেঅধঃপতনের এমন এক অন্ধকার গুহায় নিক্ষেপকরেছিল যেখান থেকে তার উন্নতি ওক্রমবিকাশের আশা করা ছিল বাতুলতা মাত্র। দুনিয়ার এআচরণের বিরুদ্ধে ইসলাম উচ্চ কন্ঠে প্রতিবাদকরে বললো যে, গতিশীল জীবন নারী ওপুরুষের উভয়ের মুখাপেক্ষী। নারীকে এ জন্যসৃষ্টি করা হয় নি যে, সে ধাক্কা খেতে থাকবে এবংতাকে জীবনের রাজপথ থেকে তুলে কাঁটার মতদূরে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ পুরুষকে সৃষ্টি করারযেমন একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে তেমনিনারীকে সৃষ্টিরও একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যআছে। মানুষের এ দু’টো শ্রেণী দিয়ে আল্লাহঅভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করেছেন,﴿ ﻟِّﻠَّﻪِ ﻣُﻠۡﻚُ ﭐﻟﺴَّﻤَٰﻮَٰﺕِ ﻭَﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِۚ ﻳَﺨۡﻠُﻖُ ﻣَﺎ ﻳَﺸَﺂﺀُۚ ﻳَﻬَﺐُ ﻟِﻤَﻦﻳَﺸَﺂﺀُ ﺇِﻧَٰﺜٗﺎ ﻭَﻳَﻬَﺐُ ﻟِﻤَﻦ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﭐﻟﺬُّﻛُﻮﺭَ ٤٩ ﺃَﻭۡ ﻳُﺰَﻭِّﺟُﻬُﻢۡ ﺫُﻛۡﺮَﺍﻧٗﺎﻭَﺇِﻧَٰﺜٗﺎۖ ﻭَﻳَﺠۡﻌَﻞُ ﻣَﻦ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﻋَﻘِﻴﻤًﺎۚ ﺇِﻧَّﻪُۥ ﻋَﻠِﻴﻢٞ ﻗَﺪِﻳﺮٞ ٥٠﴾ ‏[ ﺍﻟﺸﻮﺭﻯ : ٤٩، ٥٠‏]‘‘আসমানসমূহ ও যমীনের মালিকানা আল্লাহরই, তিনি যাচান তা-ই সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা তাকে কন্যা দানকরেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র দান করেন, আর যাকেইচ্ছা পুত্র-কন্যা উভয় প্রকার সন্তান দান করেন, আবারযাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।’’ [সূরা আশ-শুরা: ৪৯–৫০]ইসলাম নারী জাতিকে লাঞ্ছনা ও অমর্যাদাকর অবস্থানথেকে দ্রুততার সাথে উঠিয়ে এনে এমনই অধিকারও মর্যাদা দান করেছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমাররাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,‏« ﻛُﻨَّﺎ ﻧَﺘَّﻘِﻲ ﺍﻟْﻜَﻠَﺎﻡَ ﻭَﺍﻟِﺎﻧْﺒِﺴَﺎﻁَ ﺇِﻟَﻰ ﻧِﺴَﺎﺋِﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻬْﺪِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻫَﻴْﺒَﺔَ ﺃَﻥْ ﻳَﻨْﺰِﻝَ ﻓِﻴﻨَﺎ ﺷَﻲْﺀٌ ﻓَﻠَﻤَّﺎﺗُﻮُﻓِّﻲَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺗَﻜَﻠَّﻤْﻨَﺎ ﻭَﺍﻧْﺒَﺴَﻄْﻨَﺎ ‏»‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আমরাআমাদের স্ত্রীদের সাথে কথা বলতে এবং প্রাণখুলে মেলামেশা করতেও ভয় পেতাম, এ ভেবেযে, আমাদের সম্পর্কে কোনো আয়াত যেননাযিল না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরইন্তিকালের পর আমরা প্রাণ খুলে তাদের সাথেমিশতে শুরু করলাম।’’ [সহীহ বুখারী, হাদীস নং৫১৮৭]এ নির্যাতিত শ্রেণীটির বেঁচে থাকার অধিকারপর্যন্ত ছিল না। আল-কুরআন বললো যে, না, তারাওজীবিত থাকবে এবং যে ব্যক্তিই তার অধিকারেহস্তক্ষেপ করবে, মহান আল্লাহর কাছে তাকেজবাবদিহি করতে হবে।﴿ﻭَﺇِﺫَﺍ ﭐﻟۡﻤَﻮۡﺀُۥﺩَﺓُ ﺳُﺌِﻠَﺖۡ ٨ ﺑِﺄَﻱِّ ﺫَﻧۢﺐٖ ﻗُﺘِﻠَﺖۡ ٩ ﴾ ‏[ﺍﻟﺘﻜﻮﻳﺮ :٨، ٩‏]‘‘আর যখন জীবন্ত প্রোত্থিত কন্যাকে জিজ্ঞাসাকরা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করাহয়েছিল?’’ [সূরা আত-তাকভীর: ৮,৯]আব্দুল্লাহ ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকেবর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,‏«ﻣَﻦْ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﻟَﻪُ ﺃُﻧْﺜَﻰ ﻓَﻠَﻢْ ﻳَﺌِﺪْﻫَﺎ ﻭَﻟَﻢْ ﻳُﻬِﻨْﻬَﺎ ﻭَﻟَﻢْ ﻳُﺆْﺛِﺮْ ﻭَﻟَﺪَﻩُﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ – ﻗَﺎﻝَ ﻳَﻌْﻨِﻰ ﺍﻟﺬُّﻛُﻮﺭَ – ﺃَﺩْﺧَﻠَﻪُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔ ‏»‘‘যে ব্যক্তির কন্যা সন্তান আছে, আর যে তাকেজ্যান্ত কবরস্থ করে নি কিংবা তার সাথে লাঞ্ছনাকরআচরণ করে নি এবং পুত্র সন্তানকে তার উপরঅগ্রাধিকার দেয় নি, আল্লাহ তাকে জান্নাতেপ্রবেশ করাবেন।’’ [সুনান আবু দাউদ, হাদীস নম্বর:৫১৪৮]রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরোবলেছেন,‏« ﻣَﻦْ ﻋَﺎﻝَ ﺛَﻼَﺙَ ﺑَﻨَﺎﺕٍ ﻓَﺄَﺩَّﺑَﻬُﻦَّ ﻭَﺯَﻭَّﺟَﻬُﻦَّ ﻭَﺃَﺣْﺴَﻦَ ﺇِﻟَﻴْﻬِﻦَّﻓَﻠَﻪُ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔ ‏»‘‘যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তান লালন পালন করেছে,তাদেরকে উত্তম আচরণ শিখিয়েছে, বিয়েদিয়েছে এবং তাদের সাথে সদয় আচরণ করেছেসে জান্নাত লাভ করবে।’’ [সুনান আবু দাউদ, হাদীসনম্বর: ৫১৪৯]নারীদের প্রতি কোমল ব্যবহারের গুরুত্ব প্রকাশকরছে কুরআনের নিম্নোক্ত নির্দেশ,﴿ ﻭَﻋَﺎﺷِﺮُﻭﻫُﻦَّ ﺑِﭑﻟۡﻤَﻌۡﺮُﻭﻑِۚ ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ١٩‏]‘‘আর নারীদের সাথে সদয় আচরণ কর।’’ [সূরা আন-নিসা: ১৯]এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরস্ত্রীগণ উটের পিঠে সফর করছিলেন।স্ত্রীদের কাঁচের সাথে তুলনা করে তিনিবললেন,‏« ﺭُﻭَﻳْﺪًﺍ ﺳَﻮْﻗَﻚَ ﺑِﺎﻟْﻘَﻮَﺍﺭِﻳﺮ ‏»‘‘কাঁচগুলোকে (স্ত্রীদেরকে) একটু দেখেশুনে যত্নের সাথে নিয়ে যাও।’’ [সহীহ মুসলিম,হাদীস নং ৬১৮২]এসকল হাদীস থেকে আমরা নারী জাতি সম্পর্কেইসলাম মানুষের মধ্যে যে মেজাজ, আবেগ ওসহানুভূতি সঞ্চার করতে চেয়েছে তা সহজেইউপলব্ধি করতে পারি।(ঙ) মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ইনসাফ ওন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা:ইসলাম সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কেবলমাত্রউৎসাহব্যঞ্জক উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, নারীও পুরুষ উভয়ের অধিকার আইনের সামাজিক ওরাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রতিষ্ঠিত করেছে। সেআইন সর্বদিক দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ।ইসলাম নারীর শিক্ষা অর্জনের অধিকার, সম্পত্তিরঅধিকার, স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকারইত্যাদির নিশ্চয়তা বিধান করেছে। ইসলামীশরীয়াতের সীমার মধ্যে থেকে অর্থনৈতিকব্যাপারে শ্রম-সাধনা করার অনুমতি রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই।নারী ও আমাদের সমাজ :আধুনিক সমাজে নারীকে অগ্রসর ভাবা হলেওআমাদের সমাজে নারীরা এখনও অনেক পিছিয়েআছে, অনেক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত এবং বহুক্ষেত্রে তারা নির্যাতনের শিকার। আমাদেরসমাজে নারীর প্রতি বঞ্চনা ও নির্যাতনের কিছুগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে তুলে ধরছি।(ক) নারীর নিরাপত্তাজনিত সমস্যা:আমদের সমাজে নারীরা পূর্ণ নিরাপত্তা ভোগকরে না। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথেঅনেকে অপহৃত হয়। স্কুল কলেজে যাওয়ারপথে কিশোরী যুবতীরা হয়রানির শিকার হয়।প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে গ্রামঞ্চলে এখনওঅনেক নারী ধর্ষিতা হয়।(খ) নারী পাচার:নারী পাচার আমাদের দেশে একটি বিশাল সমস্যা।পাচার চক্রের সদস্যরা ছলে বলে কৌশলে কিংবাফুসলিয়ে নারীদেরকে বিভিন্ন দেশে মোটাঅংকের বিনিময়ে পাচার করে থাকে। অধিকাংশক্ষেত্রেই পাচারকৃত এসকল নারীদেরকেজোর পূর্বক দেহ ব্যবসা ও অন্যান্য অবাঞ্ছিতকাজে ব্যবহার করা হয়।(গ) বেশ্যাবৃত্তিতে নিয়োগ:বেশ্যাবৃত্তি নারীদের জন্য একটি অবমাননাকরপেশা। এ বৃত্তিতে নিয়োজিত করার জন্য বহু চক্রনারীদেরকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে এবংনানা কৌশলে পতিতালয়ে নিয়ে আসে। পতিতাবৃত্তিরপেশায় নিয়োজিত হয়ে এসব নারীদের জীবনবিষিয়ে উঠে। শুধু তাই নয় পতিতালয়েও তারা নানানির্যাতনের মুখোমুখি হয়।(ঘ) যৌন হয়রানি:আমাদের দেশে কিশোরী মেয়ে থেকে শুরুকরে বিভিন্ন বয়সের নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েথাকে। এ ক্ষেত্রে গার্মেন্টসে কর্মরতমেয়েরা সবচেয়ে বেশী শিকার হয়। বাসায়কর্মরত কাজের মেয়েদের ক্ষেত্রেও এমনটিহয়ে থাকে। তবে যে বিষয়টি অধিক দুঃখজনক তাহলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করেবিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ছাত্রীদের কেউ কেউ যৌনহয়রানির শিকার হয়।(ঙ) গর্ভবতী নারীদের নির্যাতন:অনেক পরিবারে দেখা যায় গর্ভবতী নারীরাগর্ভাবস্থায় স্বামী, শ্বাশুড়ী ও ননদ কর্তৃকনিগৃহীত হন। এ অবস্থায় নারীদের পক্ষেগৃহাস্থালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম করা সম্ভব হয় না বিধায়তারা মানসিক এবং অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনেরশিকার হন।(চ) সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা:আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরাপিতৃসম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেদেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা স্বামীরসম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়ে থাকে।(ছ) মোহরানা না দেয়া:বিপুল সংখ্যক নারী আমাদের দেশে তাদের প্রাপ্যমোহরানা থেকে বঞ্চিত থাকে। যারা মোহরানা পায়তারাও প্রায় ক্ষেত্রে নগদ পায় না। আর অনেকচতুর স্বামী বিয়ের রাতেই স্ত্রীর কাছে মাফচেয়ে নিয়ে মোহরানা আদায়ের দায়িত্ব থেকেমুক্তি লাভ করার হীন চেষ্টা করে।(জ) শিশুনারীকে শ্রমে বাধ্য করা:আমাদের দেশে এখন বিপুল সংখ্যক নারী শিশুকেশ্রমের কাজে লাগানো হয় যা অমানবিক। বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে এদের প্রায়ইনানা রকম লোমহর্ষক নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়ারকথা শুনা যায়।(ঝ) নারী শ্রমের সঠিক মুল্যায়ন না করা:বহুক্ষেত্রে নারীরা তাদের প্রাপ্য বেতন ভাতাপ্রাপ্ত হয় না। নামমাত্র বেতনে বাসা-বাড়িতে কাজেরমেয়ে ও বুয়াদেরকে রাখা হয়। এছাড়াও দৈনিকভিত্তিতে কর্মরত নারী শ্রমিক এবং গার্মেন্টসেকর্মরত মেয়েরাও চাকুরির নানা অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা থেখে প্রায়ই বঞ্চিত থাকে। মুসলিম সমাজেবহু নারীরা আজও গৃহস্থালী কাজে তাদের পুরোসময়টুকুই ব্যয় করে। অথচ তাদের এ বিশাল শ্রমেরকোন অর্থনৈতিক মূল্যয়ন আমাদের সমাজে আজওহয় নি।(ঞ) নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার:বিজ্ঞাপন চিত্রে নারীকে যৌন প্রতীক হিসেবেপ্রদর্শন করা হয়। এছাড়া ফ্যাশান শো ও সুন্দরীপ্রতিযোগিতাও নারীদেহে প্রদর্শনের একএকটি মহড়া। এসব কিছুতে মূলতঃ নারীকে পণ্যহিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা নারীরআত্মমর্যাদাবোধ, সম্মান ও মানব মর্যাদার সাথেঅসংগতিপূর্ণ।(ট) নারীর ধর্মীয় অধিকার হরণ:ধর্ম নারীকে যে সকল অধিকার দিয়েছে অনেকসময় সেক্যুলার ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেঅনেকেই তাদের অধীনস্ত নারীকে তাথেকে বঞ্চিত করে থাকে। আবার অনেকক্ষেত্রে নারীর ধর্মীয় অনুশাসন মানারক্ষেত্রেও অনেক অন্তরায় সৃষ্টি করা হয়। যেমননারীকে তার হিজাব পরিধানের অধিকার থেকেবঞ্চিত করার জন্য অনেক সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানহিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করে। এছাড়াও আমাদেরদেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানে নারীকেপুরুষের সাথে একই কর্মক্ষেত্রে কাজ করতেবাধ্য করা হয়। এর ফলে ইসলাম নারীকে নিজস্বকর্মক্ষেত্রে কাজ করার যে অধিকার দিয়েছে তাচরমভাবে শুধু বিঘ্নিতই হয় নি, বরং পুরুষসহকর্মীদের দ্বারা তারা অনেক সময়ই যৌননির্যাতনের শিকারও হয়ে থাকেন।(ঠ) তালাকের অপব্যবহার:স্বামী-স্ত্রীর সুন্দর সহাবস্থান সম্ভব না হলেইসলাম তাদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্যতালাকের বিধান দিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রেপ্রাথমিকভাবে তালাক দেওয়ার অধিকার স্বামীর হাতেন্যস্ত করেছে। অনেক স্বামীই তালাকেরঅপব্যবহার করে তাদের স্ত্রীদের প্রতি নির্যাতনকরে থাকে। সে ক্ষেত্রে তালাক হয় নির্যাতনেরএকটি হাতিয়ার।নারী নির্যাতন রোধে ইসলামের ভূমিকা:ইতঃপূর্বের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে,ইসলাম নারীর মান মর্যাদা ও ইজ্জত-আব্রুহেফাযতের ব্যবস্থাই শুধু করে নি, বরং নারী যাতেকোনোক্রমেই দৈহিক কিংবা মানসিকভাবে অত্যাচারিতও নির্যাতিত না হয় সে রকম দিক-নির্দেশনা দিয়েছেএবং তদনুযায়ী নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধান জারী করেছে।নিচে তার একটি ছোট্ট বিবরণ দেয়া হল:১. ইসলাম নারীর সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করেছে।রাস্তায়, কর্মস্থলে ও যত্রতত্র নারীদেরকেহয়রানি করা তো দূরের কথা বরং ইসলাম নারীদেরসৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে অবনত রাখার নির্দেশদিয়েছে। আল্লাহ বলেন,﴿ﻗُﻞ ﻟِّﻠۡﻤُﺆۡﻣِﻨِﻴﻦَ ﻳَﻐُﻀُّﻮﺍْ ﻣِﻦۡ ﺃَﺑۡﺼَٰﺮِﻫِﻢۡ ﻭَﻳَﺤۡﻔَﻈُﻮﺍْ ﻓُﺮُﻭﺟَﻬُﻢۡۚﺫَٰﻟِﻚَ ﺃَﺯۡﻛَﻰٰ ﻟَﻬُﻢۡۚ ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﻮﺭ : ٣٠‏]‘‘মুমিনদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনতরাখে এবং নিজদের লজ্জাস্থান হেফাযত করে। এটাতাদের জন্য পবিত্রতম।’’ [সূরা আন-নূর: ৩০]ইসলামের স্বর্ণযুগে দেখা যায়, নারীরা সুদূর বাগদাদথেকে মক্কা নগরীতে একাকী গমন করলেওতাদেরকে কেউ উত্যক্ত করত না। কেননা এরকমনিরাপত্তাই ইসলামী সমাজে প্রত্যাশিত। যারানারীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকী, ইসলামতাদেরকে তা‘যীরমূলক শাস্তি দেয়ার পথ খোলারেখেছে। আর কেউ যেন নারীকে হয়রানি নাকরে বরং বোনের দৃষ্টিতে দেখে সেজন্যেপুরুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করারউদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেছেন,‏« ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺍﻟﻨِّﺴَﺎﺀُ ﺷَﻘَﺎﺋِﻖُ ﺍﻟﺮِّﺟَﺎﻝ ‏»‘‘নারীরা পুরুষদের সহোদরা’’। [সুনান আবি দাউদ১/২৯৯, হাদীস নং ২৩৬]শুধু তাই নয় ইসলামে নারীকে ধর্ষণ করা কিংবা করারচেষ্টা করা ও নারীকে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তিঅত্যন্ত ভয়াবহ; যাতে খারাপ চিত্তের পুরুষগণ এসবঅবাঞ্ছিত কাজ থেকে বিরত থাকে।২. ইসলাম ব্যভিচার, দেহব্যবসা, নগ্নতা, বেহায়াপনা,অশ্লীলতা ও দেহপ্রদর্শনীকে নিষিদ্ধকরেছে। আল্লাহ বলেন,﴿ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻘۡﺮَﺑُﻮﺍْ ﭐﻟﺰِّﻧَﻰٰٓۖ ﺇِﻧَّﻪُۥ ﻛَﺎﻥَ ﻓَٰﺤِﺸَﺔٗ ﻭَﺳَﺂﺀَ ﺳَﺒِﻴﻠٗﺎ ٣٢﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٣٢‏]‘‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না।নিশ্চয় তা অশ্লীলতা ও খারাপ পথ।’’ [ সূরা আল-ইসরা:৩২]﴿ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻘۡﺮَﺑُﻮﺍْ ﭐﻟۡﻔَﻮَٰﺣِﺶَ ﻣَﺎ ﻇَﻬَﺮَ ﻣِﻨۡﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺑَﻄَﻦَۖ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻌﺎﻡ :١٥١‏]‘‘আর তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতারকাছাকাছি যেয়ো না।’’ [সূরা আল-আন‘আম: ১৫১]অতএব ইসলামে বেশ্যাবৃত্তির কোনো স্থান নেইএবং নারীদেরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহারেরওকোনো বিধান নেই। বরং এ সবই ইসলামেরদৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। ইসলামের এ অনুশাসন মেনেচললে এগুলোর কারণে নারী যে নির্যাতন ওঅবমাননার মুখোমুখি হয় সে পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।৩. ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছেইতঃপূর্বে তার কিছু বিবরণ দেয়া হয়েছে, সেসবঅধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করার কোনো বৈধতাইসলামে নেই। ইসলাম নর-নারী উভয়কেউত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণ করে বলেছে﴿ ﻓَﺮِﻳﻀَﺔٗ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻠَّﻪِۗ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ١١‏]“এটা বাস্তবায়ন আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয।” [সূরাআন-নিসা:১১] ইসলাম নারীদেরকে দায়িত্বভারঅনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রেপুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি দিলেও অনেকক্ষেত্রে দায়িত্বের পার্থক্য না থাকায় সমান সম্পত্তিদিয়েছে। যেমন পূর্বের আয়াতটিরই একাংশে বলাহয়েছে,﴿ ﻭَﻟِﺄَﺑَﻮَﻳۡﻪِ ﻟِﻜُﻞِّ ﻭَٰﺣِﺪٖ ﻣِّﻨۡﻬُﻤَﺎ ﭐﻟﺴُّﺪُﺱُ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ١١‏]“বাবা-মা প্রত্যেকের জন্য রয়েছে একষষ্ঠাংশ।” [সূরা আন-নিসা : ১১]নারীর মোহরানার অধিকার সম্পর্কে ইসলামবলেছে,﴿ﻗَﺪۡ ﻋَﻠِﻤۡﻨَﺎ ﻣَﺎ ﻓَﺮَﺿۡﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴۡﻬِﻢۡ ﻓِﻲٓ ﺃَﺯۡﻭَٰﺟِﻬِﻢۡ ﴾ ‏[ ﺍﻻﺣﺰﺍﺏ :٥٠‏]‘‘আমি জানি আমি তাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কী(মোহরানা) ফরয করেছি।’’ [সূরা আল-আহযাব: ৫০]নারীদেরকে যত অধিকার আল্লাহ দিয়েছেন তাথেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার মাধ্যমেতাদেরকে নির্যাতন করার এখতিয়ার কারো নেই।এছাড়া নারীর গৃহাস্থলী কাজের স্বীকৃতি আমরাদেখতে পাই আমীরুল মু’মেনীন উমার ইবনুলখাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর জীবনে। এক ব্যক্তি তারস্ত্রীর দৌরাত্মপনা সম্পর্কে অভিযোগ করার জন্যতার কাছে এসে দেখল যে, স্বয়ং উমার রাদিয়াল্লাহু‘আনহুর স্ত্রী চেঁচামেচি করছে আর উমাররাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ধৈর্য ধরে চুপ করে আছেন। সেব্যক্তি ভাবল উমারের অবস্থা তো দেখি আমারচেয়ে খারাপ। তাই কিছুটা বিফল মনোরথ হয়ে সেচলে যেতে থাকলে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তারআগমন ও প্রস্থান টের পেয়ে তাকে ডাকলেনএবং সবকিছু শুনে বললেন, দেখ আমাদেরস্ত্রীদের অবদান আমাদের প্রতি অনেকবেশী। সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের যথেষ্টসহনশীল হওয়া উচিত।৪. বাসা-বাড়ীতে কর্মরত কাজের মেয়ে এবং বুয়াক্রীতদাসী নয়। ক্রীতদাস প্রথা আজ আর নেই।অথচ বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম এমন কি ক্রীতদাস-দাসীদের প্রতিওসদয় আচরণের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন,‏« ﺃَﺭِﻗَّﺎﺀَﻛُﻢْ ﺃَﺭِﻗَّﺎﺀَﻛُﻢْ ﺃَﺭِﻗَّﺎﺀَﻛُﻢْ ﺃَﻃْﻌِﻤُﻮﻫُﻢْ ﻣِﻤَّﺎ ﺗَﺄْﻛُﻠُﻮﻥَﻭَﺍﻛْﺴُﻮﻫُﻢْ ﻣِﻤَّﺎ ﺗَﻠْﺒَﺴُﻮﻥ ‏» ‘‘তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান!তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান!তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান!তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবেএবং তোমরা যা পরবে তাদেরকে তা পরতেদেবে।’’ [মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৬৪০৯, ২১৪৮৩,২১৫১৫, আত-তাবাকাত আল-কুবরা ২/১৮৫]। সুতরাং তাদেরপ্রতি দূর্ব্যবহার করার কোনো স্থান ইসলামেনেই।৫. নারীকে যে কোন ছুতোয় দৈহিকভাবে কিংবামানসিকভাবে নির্যাতন করা শরীয়তে বৈধ নয়। স্বয়ংরাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবনেতার কোনো স্ত্রী কিংবা কন্যার গায়ে হাততোলেন নি।৬. নারীকে অপবাদ দিয়ে মানসিক নির্যাতন করাইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন,﴿ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺮۡﻣُﻮﻥَ ﭐﻟۡﻤُﺤۡﺼَﻨَٰﺖِ ﺛُﻢَّ ﻟَﻢۡ ﻳَﺄۡﺗُﻮﺍْ ﺑِﺄَﺭۡﺑَﻌَﺔِ ﺷُﻬَﺪَﺁﺀَﻓَﭑﺟۡﻠِﺪُﻭﻫُﻢۡ ﺛَﻤَٰﻨِﻴﻦَ ﺟَﻠۡﺪَﺓٗ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻘۡﺒَﻠُﻮﺍْ ﻟَﻬُﻢۡ ﺷَﻬَٰﺪَﺓً ﺃَﺑَﺪٗﺍۚ ﻭَﺃُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَﻫُﻢُ ﭐﻟۡﻔَٰﺴِﻘُﻮﻥَ ٤ ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﻮﺭ : ٤‏]“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপকরে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না,তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরাকখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাইহলো ফাসিক।” [সূরা আন-নূর : ৪]৭. স্বামী-স্ত্রীর অস্বস্তিকর জীবনের সুন্দরসমাধানের জন্য ইসলাম তালাকের বিধান রেখেছে।স্বামীর হাতে যদিও তালাকে প্রাথমিক অধিকার ন্যস্তহয়েছে, কিন্তু সে অধিকার অন্যায়ভাবে প্রয়োগকরাও শরীয়তে আরেকটি অন্যায় ও গোনাহরূপেবিবেচিত। মূলত বিবাহ যেমন mutual understandingএর ভিত্তিতে হয়ে থাকে তেমনি তালাকও সেরকমবোঝাপড়ার মধ্যে সম্পন্ন হওয়াই ইসলামেরনির্দেশ। এজন্যই সাংসারিক অশান্তি দেখা দিলেউভয়ের মধ্যে দুপক্ষের সালিস বসিয়ে একটিসমাধানে পৌছার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,﴿ﻭَﺇِﻥۡ ﺧِﻔۡﺘُﻢۡ ﺷِﻘَﺎﻕَ ﺑَﻴۡﻨِﻬِﻤَﺎ ﻓَﭑﺑۡﻌَﺜُﻮﺍْ ﺣَﻜَﻤٗﺎ ﻣِّﻦۡ ﺃَﻫۡﻠِﻪِۦﻭَﺣَﻜَﻤٗﺎ ﻣِّﻦۡ ﺃَﻫۡﻠِﻬَﺂ ﺇِﻥ ﻳُﺮِﻳﺪَﺁ ﺇِﺻۡﻠَٰﺤٗﺎ ﻳُﻮَﻓِّﻖِ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﺑَﻴۡﻨَﻬُﻤَﺂۗ ﺇِﻥَّﭐﻟﻠَّﻪَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﻠِﻴﻤًﺎ ﺧَﺒِﻴﺮٗﺍ ٣٥ ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٣٥‏]“আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যেবিচ্ছেদের আশংকা কর তাহলে স্বামীর পরিবারথেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবারথেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায়তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করেদেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যকঅবগত।” [সূরা আন-নিসা : ৩৫]কুরআনের spirit হচ্ছে দু’পক্ষ ব্যাপক আলোচনারভিত্তিতেই একমত হয়ে তালাকের সিদ্ধান্ত নিবে।সালিসের পর করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,﴿ﻓَﺈِﻣۡﺴَﺎﻙُۢ ﺑِﻤَﻌۡﺮُﻭﻑٍ ﺃَﻭۡ ﺗَﺴۡﺮِﻳﺢُۢ ﺑِﺈِﺣۡﺴَٰﻦٖۗ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٢٩‏]“অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবাসুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে।” [সূরা আল-বাকারাহ :২২৯]রাগের মাথায় তালাকের বিধান মূলত ইসলামে সমর্থিতনয়। এজন্যই প্রায় সকল মুসলিম আলেম একমত যে,প্রচণ্ড রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞানহারা হয়ে তালাকদিলে তালাক কার্যকর হবে না। এছাড়া তিন তালাকএকসাথে দিলে ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ ও ইবনুলকাইয়েমসহ আরো অনেক মুসলিম স্কলারেরমতে এক তালাকই পতিত হবে। এসব তথ্য জানাথাকলে তালাকের অপব্যবহার বহুলাংশে রোধ করাসম্ভব।৮. আখেরাতের জবাবদিহিতা:যদি কেউ নারী নির্যাতন করে থাকে তাহলেআখেরাতে তাকে এজন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহিকরতে হবে। এ ব্যাপারে আয়াত ও হাদীসের সংখ্যাঅত্যন্ত ব্যাপক। মূলত জবাবদিহিতা একজন মুসলিমকেউত্তম চরিত্রের মুসলিমে পরিণত করে।উপসংহার:বস্তুত ইসলামই যেমন নারীকে দিয়েছে সকলন্যায্য অধিকার, তেমনি তাকে হেফাযতের ব্যবস্থাকরেছে সকল প্রকার নির্যাতন থেকে। কেননাইসলামী বিধান তো সে মহান সত্ত্বার কাছ থেকেঅবতারিত যিনি নারীর স্রষ্টা। সুতরাং নারী-নির্যাতন মুক্তসমাজ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের জন্য ইসলামীঅনুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। যদিপ্রকৃতই ইসলাম মেনে চলা হয় তাহলে নারীরনির্যাতিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

Advertisements