অধ্যয়ন ও জ্ঞানসাধনা (১ম পর্ব)


ইলমের সংজ্ঞা

ওলামায়ে কেরামের পরিভাষায় শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন-
العلم بالكسر وسكون اللام: في عرف العلماء يطلق على معان منها، الإدراك مطلقا
ইলম শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। এগুলোর একটি অর্থ হচ্ছে অনুধাবন ও উপলব্ধি করা। দার্শনিকগণ এই অর্থের প্রবক্তা।
কেউ কেউ বলেন,
ومنها التصديق مطلقا، يقينياكان أو غيره والعلم بمعنى اليقين في اللغة
‘ইলমের অর্থ সত্যায়ন করা। চাই তা ইয়াকিনী হোক বা অন্য কিছু। আর অভিধান অনুযায়ী ইলম অর্থ ইয়াকিন বা বিশ্বাস।’
এর এক অর্থ হচ্ছে التعقل বা আকলের সাহায্যে অনুধাবন করা। আর এই অর্থের ভিত্তিতেই ইলম শব্দটি কল্পনা, ধারণা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইলমের আরেকটি অর্থ হচ্ছে:
إدراك المسائل عن دليل
তথা দলিলের ভিত্তিতে মাসআলা আয়ত্ব করা।
বস্তুত: ইলম হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার সিফাত বা অনন্য গুণাবলিসমূহের একটি, যা ইলমের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে।
ইলমের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পূর্বসূরীগণ এর অন্তর্নিহিত একটি সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। যেই সংজ্ঞায় ইলমের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত ইলমের আলামত ফুটে ওঠে। যেমন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন,
ليس العلم بكثرة الرواية، إنما العلم خشية الله
‘বেশি বর্ণনা করা ও অধিক পরিমাণ আক্ষরিক জ্ঞান হাসিল করার নাম ইলম নয়, বরং ইলম হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার ভয়ের নাম।’
ইমাম মালেক (রহ.) বলতেন,
الحكمة والعمل نور يهدي به الله من يشاء وليس بكثرة المسائل ، ولكن عليه علامة ظاهرة وهو التجافي عن دار الغرور والإنابة إلي دار الخلود
‘হেকমত ও আমল হচ্ছে একটি নূর। যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা তাকে পথ দেখান। আর বেশি বেশি মাসআলা জানার নাম ইলম নয়। এর একটি আলামত আছে। তা হচ্ছে, ইলমের বদৌলতে প্রতারণার এই জগত থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং চিরস্থায়ী জগতের দিকে ধাবিত হওয়া।’
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন,
وما العلم إلا العمل به والعمل به ترك العاجل للآجل
‘ইলম হচ্ছে আমলের নাম। আর আমল হলো স্থায়ী জগতের স্বার্থে ক্ষণস্থায়ী জগত পরিহার করা।’

মুমিন হতে হলে ইলম জরুরী
অনেকের ধারণা, ইলমের বিষয়টি কেবল ফযীলতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ ইলম হাসিল করা ভালো এবং সওয়াবের কাজ আর না করা দোষণীয় নয় তবে ছাওয়াব ও ফযীলত থেকে বঞ্চিত হওয়ার নামান্তর মাত্র। কিন্তু বিষয়টি কি আদৌ এমন? ফযীলতের মধ্যেই কি ইলম সীমাবদ্ধ? মোটেই তা নয়। বরং একজন মানুষের প্রকৃত মুমিন হওয়া নির্ভর করে ইলম হাসিলের ওপর। কারণ কোনো ব্যক্তি ইলম হাসিল করা ছাড়া প্রকৃতি মুমিনই হতে পারে না। কেননা মুমিন হওয়া নির্ভর করে দুটি বস্তুর ওপর। এক. সে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না। দুই. শরীয়ত নির্দেশিতপন্থা ছাড়া ইবাদত করবে না। আর এ দুটিই হচ্ছে তাওহীদের মর্মবাণী। যথা:
أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمداً عبده ورسوله
‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।’
সুতরাং তাওহীদের মর্মবাণীর মধ্যে ইলম অপরিহার্যভাবে জড়িত ও পরিব্যপ্ত। অতএব বোঝা গেল, ইলম ছাড়া তাওহীদের মর্মবাণী যথার্থভাবে উপলব্ধি হয়নি। একারণেই ইমাম বুখারী (রহ.) সহীহ বুখারীতে ইলমকে আমলের আগে প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন এবং একটি অধ্যায় কায়েম করেছেন নিম্নোক্ত শিরোনামে-
بَاب الْعِلْمُ قَبْلَ االْقَوْلِ وَالْعَمَلِ لِقَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: (فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ)
‘এ অধ্যায় কথা ও কাজের আগে ইলম- এ বিষয়ে। যেমন আল্লাহও বলেছেন, ‘তোমরা জানো যে আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই’।

ইলম: বান্দার প্রতি আল্লাহর প্রথম উপহার
আল্লাহ তা‘আলা মানুষ সৃষ্টি করার তাদেরকে বিভিন্ন রকমের নেয়ামত দান করেছেন। মানুষের প্রতি তাঁর করুণা ও দান এত বিস্তৃত ও সীমাহীন যে, কারো পক্ষে সে সব নেয়ামতের হিসাব করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো কোনো নেয়ামত এত মূল্যবান যে, যা হাজার নেয়ামতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাও ওই সব নেয়ামতের কথা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। বান্দার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অমূল্য নেয়ামতরাজির অন্যতম হচ্ছে ইলম।
ইলম শুধু মহা নেয়ামতই নয়; বরং বান্দার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার প্রথম উপহার, যা তিনি বান্দা তথা মানুষ সৃষ্টি করার পর তাকে দান করেছিলেন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করার আগে ফেরেশতাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তারা নেতিবাচক পরামর্শ দেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এর জবাবে বলেন,
﴿ وَإِذۡ قَالَ رَبُّكَ لِلۡمَلَٰٓئِكَةِ إِنِّي جَاعِلٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ خَلِيفَةٗۖ قَالُوٓاْ أَتَجۡعَلُ فِيهَا مَن يُفۡسِدُ فِيهَا وَيَسۡفِكُ ٱلدِّمَآءَ وَنَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَۖ قَالَ إِنِّيٓ أَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُونَ ٣٠ ﴾ [البقرة: ٣٠]
‘আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, ‘নিশ্চয় আমি যমীনে একজন খলীফা সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে ফাসাদ করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে? আর আমরা তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আমি জানি যা তোমরা জান না।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩০}
এরপর তিনি আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন। তাকে সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম ইলম শিক্ষা দেন এবং ইলমকেই ফেরেশতাদের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে সাব্যস্ত করেন। যেমন পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿ وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلۡأَسۡمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمۡ عَلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِ‍ُٔونِي بِأَسۡمَآءِ هَٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣١ ﴾ [البقرة: ٣١]
‘আর তিনি আদমকে নামসমূহ সব শিক্ষা দিলেন তারপর তা ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতপর বললেন, ‘তোমরা আমাকে এগুলোর নাম জানাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩১}
মোটকথা, আল্লাহ তখন মানুষ সৃষ্টিতে দ্বিমতকারী ফেরেশতাদের সামনে কিছু বিষয় পেশ করেন যার জবাব দিতে তারা ব্যর্থ হন এবং তখন আদম (আ.)-কে সেগুলোর জবাব দিতে বলেন। যেসব বিষয়ে ফেরেশতারা নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করেন সেগুলো আদম (আ.) প্রকাশ করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। আল্লাহ তা‘আলা এভাবে ফেরেশতাদের সামনে ইলমের মাহাত্ম্য প্রকাশ করেন এবং ইলম গ্রহণকারী মানুষকে তাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন। সুতরাং বুঝা গেল, নিষ্পাপ ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো ইলম- আল্লাহ তা‘আলা যা মানুষকে প্রথম উপহার হিসেবে দান করেছেন।
ইলম আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে শুধু উপহারই নয়; বরং অসামান্য অনুগ্রহও বটে। তিনি কুরআনের বহু স্থানে বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ বিশেষ দান-অনুগ্রহের কথা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। আর যে দান ও অনুগ্রহ সবিশেষ মূল্যবান সেটি হচ্ছে ইলম। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ خَلَقَ ٱلۡإِنسَٰنَ ٣ عَلَّمَهُ ٱلۡبَيَانَ ٤ ﴾ [الرحمن: ٣، ٤]
‘মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে বয়ান শিক্ষা দিয়েছেন।’ {সূরা আর-রহমান, আয়াত: ৩-৪}

ইলম ও আলেমের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর বাণী
সাধারণ মুমিনের চেয়ে আলেমের মর্যাদা বহু গুণ বেশি: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ يَرۡفَعِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَٰتٖۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٞ ١١ ﴾ [المجادلة: ١١]
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ {সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ১১}
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, ‘সাধারণ মুমিনের চেয়ে আলেমের মর্যাদা সাতশত গুণ বেশি। এবং প্রতিটি মর্যাদার মধ্যে দূরত্ব পাঁচশত বছরের সমান।’

আলেমের নাম আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে!
আল্লাহ আলেমদেরকে কী পরিমাণ মর্যাদা দান করেছেন তার বড় প্রমাণ তিনি নিজের নামের সঙ্গে তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন-
﴿ شَهِدَ ٱللَّهُ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَأُوْلُواْ ٱلۡعِلۡمِ قَآئِمَۢا بِٱلۡقِسۡطِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ١٨ ﴾ [ال عمران: ١٨]
আলেমগণকে তাঁর নিজের নামের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। কেননা যে যাকে ভালোবাসেন তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেন। একারণেই আল্লাহ তা‘আলা ওলামায়ে কেরামের নাম নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন এবং এর কারণ হচ্ছে; মানুষের মধ্যে আলেমগণই আল্লাহ তা‘আলার কাছে বেশি সম্মানিত ও প্রিয়। ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাফসীরে লেখেন-
وفي هذه الآية دليل على فضل العلم وشرف العلماء وفضلهم ، فإنه لو كان أحد أشرف من العلماء لقرنهم الله باسمه واسم ملائكته كما قرن اسم العلماء
‘আলোচ্য আয়াত ইলম ও ওলামায়ে কেরামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দলিল। কেননা ওলামায়ে কেরাম ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহ তা‘আলার কাছে অধিক সম্মানিত হলে তিনি নিজের নামের সঙ্গে তাদের নামই উল্লেখ করতেন।’
আলেমদের এই সম্মান ও মর্যাদার কারণ হচ্ছে, একমাত্র তারাই যথাযথভাবে এবং হক অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করেন ও তার বিধান সহীহ তরীকায় পালন করতে সচেষ্ট থাকেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ إِنَّمَا يَخۡشَى ٱللَّهَ مِنۡ عِبَادِهِ ٱلۡعُلَمَٰٓؤُاْۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ ٢٨ ﴾ [فاطر: ٢٨]
“কেবলমাত্র আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করে, নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।” [সূরা ফাতির: ২৮]
এমনিভাবে নবুওয়াতের সাক্ষীদাতা হিসেবে আলেমরাই যথেষ্ট বলে কুরআনে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ وَيَقُولُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَسۡتَ مُرۡسَلٗاۚ قُلۡ كَفَىٰ بِٱللَّهِ شَهِيدَۢا بَيۡنِي وَبَيۡنَكُمۡ وَمَنۡ عِندَهُۥ عِلۡمُ ٱلۡكِتَٰبِ ٤٣ ﴾ [الرعد: ٤٣]
“আর কাফিররা বলে, আপনি প্রেরিত রাসূল নন, বলুন, আমাদের ও তোমাদের মাঝে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট, আর যার কাছে রয়েছে কিতাবের জ্ঞান”। [সূরা আর-রা‘দ:৪৩]
ইলমের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা এক অবিশ্বাস্য শক্তি সন্নিহিত করেছেন। বিষয়টি অনুধাবন করা যায় সুলায়মান (আ.)-এর দরবারে রাণী বিলকিসের সিংহাসন উপস্থিত করার ঘটনায়। নবী সুলায়মান (আ.) তখন শামে অবস্থান করছিলেন। আর বিলকিসের রাজত্ব ও সিংহাসন ছিল ইয়ামানে অবস্থিত। তিনি সেখান থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিলকিসের সিংহাসন আনার আগ্রহ প্রকাশ করলে ইফরিত জিন্ন মজলিস থেকে ওঠে পুনরায় ফিরে আসার সময়ের মধ্যে তা হাজির করার সামর্থের কথা জানায়। কিন্তু এই প্রস্তাব সুলায়মান (আ.)-এর মনোপুত হলো না। কেননা এরচেয়েও কম সময়ের মধ্যে তিনি সিংহাসন নিজের সামনে উপস্থিত দেখতে চাচ্ছিলেন। তখন দরবারে যে ব্যক্তি আসমানী কিতাবের অধিকারী ছিলেন তিনি বললেন-
﴿ قَالَ ٱلَّذِي عِندَهُۥ عِلۡمٞ مِّنَ ٱلۡكِتَٰبِ أَنَا۠ ءَاتِيكَ بِهِۦ قَبۡلَ أَن يَرۡتَدَّ إِلَيۡكَ طَرۡفُكَۚ ﴾ [النمل: ٤٠]
‘আর যার কাছে কিতাবের ইলম ছিল, সে বলল, আমি এরচেয়েও কম সময়ে- চোখের পলক পড়ার আগেই আপনার সামনে তা উপস্থিত করতে পারি।’ {সূরা আন-নামল, আয়াত: ৪০}
এই বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ইলমের বরকতে এবং ইলমের কল্যাণে। ওই ব্যক্তি ইলমের শক্তিবলে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে সিংহাসন উপস্থিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ীত্ব, আখেরাতের অবশ্যম্ভাবিতা এবং করণীয় সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত বলে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলাই তাদেরকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। কারূনের সীমাহীন ধন-সম্পদ দেখে সাধারণ মানুষের চোখ যখন ধাঁধিয়ে গিয়েছিল এবং সবাই এই পাপীর মতো সম্পদের প্রাচুর্য্য কামনা করছিল তখন বিচক্ষণ আলেমগণ নিজেদেরকে এই ঘৃণিত কামনা থেকে বিরত রাখলেনই, সেই সঙ্গে সাধারণ লোকদের এই কামনাকে চরম ধিকৃত বলে প্রকাশ করলেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ وَقَالَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ وَيۡلَكُمۡ ثَوَابُ ٱللَّهِ خَيۡرٞ لِّمَنۡ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗاۚ وَلَا يُلَقَّىٰهَآ إِلَّا ٱلصَّٰبِرُونَ ٨٠ ﴾ [القصص: ٨٠]
‘আর যারা জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিল, তারা বলল, ‘ধিক তোমাদেরকে! আল্লাহর প্রতিদানই উত্তম যে ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তার জন্য। আর তা শুধু সবরকারীরাই পেতে পারে।’ {সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৮০}
আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিব্যবস্থা, তাঁর কুদরত ও কার্যাবলির হেকমত কারো পক্ষে অনুধাবন করা আদৌ সম্ভব নয়। তিনি যেমন মহান তাঁর যাবতীয় কার্যও মহান এবং সূক্ষ্ম ও হেকমতপূর্ণ। তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে যা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তবে আলেমগণকে আল্লাহ তা‘আলা তার কর্মকাণ্ডের যৎকিঞ্চিত হেকমত ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ وَتِلۡكَ ٱلۡأَمۡثَٰلُ نَضۡرِبُهَا لِلنَّاسِۖ وَمَا يَعۡقِلُهَآ إِلَّا ٱلۡعَٰلِمُونَ ٤٣ ﴾ [العنكبوت: ٤٣]
‘আমি এসব উপমা উপস্থাপন করি। তবে আলেমগণ ছাড়া অন্য কেউ তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।’ {সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৪৩}
জীবন চলার পথে, সামাজিক নানা সমস্যা ও বিপদাপদে সাধারণ মানুষকে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং ওলামায়ে কেরামকে সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থলের মর্যাদা দান করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ فَسۡ‍َٔلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ ٤٣ ﴾ [النحل: ٤٣]
‘সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জানো।’ {সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩}
একমাত্র ওলামায়ে কেরামই যুগসমস্যার সমাধান এবং ইসলামের প্রকৃত ও যথার্থ দিকনির্দেশনা করতে পারেন বলে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন। মানুষের অজ্ঞাত ও অবোধ্য বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ইলমের প্রতিনিধি উলামায়ে কিরামের শরণাপন্ন হতে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ وَلَوۡ رَدُّوهُ إِلَى ٱلرَّسُولِ وَإِلَىٰٓ أُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنۡهُمۡ لَعَلِمَهُ ٱلَّذِينَ يَسۡتَنۢبِطُونَهُۥ مِنۡهُمۡۗ وَلَوۡلَا فَضۡلُ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ وَرَحۡمَتُهُۥ لَٱتَّبَعۡتُمُ ٱلشَّيۡطَٰنَ إِلَّا قَلِيلٗا ٨٣ ﴾ [النساء: ٨٣]
‘আর যদি তারা সেটি রাসূলের কাছে এবং তাদের কর্তৃত্বের অধিকারীদের কাছে পৌঁছে দিত, তাহলে অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা তা উদ্ভাবন করে তারা তা জানত। আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত না হত, তবে অবশ্যই অল্প কয়েকজন ছাড়া তোমরা শয়তানের অনুসরণ করতে।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮৩}
মুফাসসিরগণ লিখেছেন-
وألحق رتبتهم برتبة الأنبياء في كشف حكم الله
‘বস্তুত এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার বিধান নির্গত করার দিক দিয়ে ওলামায়ে কেরামকে নবীগণের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।’
ইমাম আবূ বকর জাস্‌সাস (রহ.) কুরআনে বর্ণিত তাদের ফযীলতের কথা উল্লেখ করে আহকামুল কুরআনে উল্লেখ করেন-
وأن من استدل على حكمه واستنبط معناه فحمله على المحكم المتفق على معناه فهو ممدوح مأجور ممن قال الله تعالى (لعلمه الذين يستنبطونه منهم)
‘যেসব লোক হুকুম আহকামের ব্যাপারে গবেষণা করে এবং সঠিক অর্থ প্রকাশ করে অতপর তা সঠিক অর্থে প্রয়োগ করে সে প্রশংসিত এবং প্রতিদানযোগ্য। আর আল্লাহ তা‘আলা তাদের ব্যাপারেই এই আয়াতটি ইরশাদ করেছেন।
তিনি ওলামায়ে কেরামকে জাতির দিকনির্দেশক ও পথপ্রদর্শক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘যেহেতু ওলামায়ে কেরামই আল্লাহ তা‘আলার আদেশ-নিষেধ ভালোভাবে জানেন তাই কওমের লোকদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের আদেশ মান্য করা এবং তাদের অনুসরণ করা।’
জ্ঞান-বিজ্ঞানের চিরন্তন উৎস আল-কুরআনের বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার আলেমদের সিনায় সংরক্ষিত বলে কুরআনে ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ بَلۡ هُوَ ءَايَٰتُۢ بَيِّنَٰتٞ فِي صُدُورِ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَۚ ﴾ [العنكبوت: ٤٩]
‘বরং এটি হচ্ছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী, যা যাদেরকে ইলমের অধিকারী করা হয়েছে তাদের বক্ষে সংরক্ষিত।’ {সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৪৯}

কুরআনের ইলম আলোকবিচ্ছরণকারী নূর
﴿ وَلَقَدۡ جِئۡنَٰهُم بِكِتَٰبٖ فَصَّلۡنَٰهُ عَلَىٰ عِلۡمٍ هُدٗى وَرَحۡمَةٗ لِّقَوۡمٖ يُؤۡمِنُونَ ٥٢ ﴾ [الاعراف: ٥٢]
‘আর আমি তো তাদের নিকট এমন কিতাব নিয়ে এসেছি, যা আমি জেনেশুনে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। তা হিদায়াত ও রহমতস্বরূপ এমন জাতির জন্য, যারা ঈমান রাখে।’ {সূরা আল-‘আরাফ, আয়াত: ৫২}
আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুফাসসির মুহাম্মাদ আমিন শানকিতী (রহ.) বলেন,
ولا شك أن هذا القرآن العظيم هو النور الذي أنزله الله إلى أرضه ليستضاء به فيعلم في ضوئه الحق من الباطل والحسن من القبيح والنافع من الضار والرشد من الغي
‘সন্দেহ নেই যে, এই কুরআনই হচ্ছে সেই নূর, যা আল্লাহ তা‘আলা ভূপৃষ্ঠকে আলোকময় করতে অবতীর্ণ করেছেন। যাতে সেই আলোর সাহায্যে হক ও বাতিল এবং ভালো ও মন্দ পার্থক্য করা যায়। ক্ষতি ও উপকারী বস্তু চেনা যায়। ভ্রান্তি থেকে সঠিক পথের দিশা পাওয়া যায়।’
ইলমকে আল্লাহ মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ লেবাস বলে অভিহিত করেছেন। যথা-
﴿ يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞۚ ذَٰلِكَ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ لَعَلَّهُمۡ يَذَّكَّرُونَ ٢٦ ﴾ [الاعراف: ٢٦]
‘হে বনী আদম, আমি তো তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাক, তা উত্তম। এগুলো আল্লাহর আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ {সূরা আল-‘আরাফ, আয়াত: ২৬}
কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, আলোচ্য আয়াতে লিবাস দ্বারা ইলম, রী-শা দ্বারা ইয়াকিন এবং লিবাসুত তাকওয়া দ্বারা লজ্জাশীলতা উদ্দেশ্য।
এসব আয়াত ছাড়াও আরো বহু আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইলম ও ইলমের বাহকদের প্রশংসা করেছেন। সেই সঙ্গে মূর্খতা ও ইলমহীনতার নিন্দাও করেছেন কুরআনের বহু জায়গায়।

মূর্খতার নিন্দা
মূর্খতা হচ্ছে আত্মার মৃত্যু এবং জীবন যবেহ ও হায়াত ধ্বংস করার নাম। কুরআনে মূর্খতা থেকে বেঁচে থাকতে এবং এর নিন্দা জ্ঞাপন করে ইরশাদ হয়েছে-
﴿ إِنِّيٓ أَعِظُكَ أَن تَكُونَ مِنَ ٱلۡجَٰهِلِينَ ٤٦ ﴾ [هود: ٤٦]
‘আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও।’ {সূরা হূদ, আয়াত: ৪৬}
শুধু তাই নয়; অন্য আয়াতে মূর্খতাকে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন-
﴿ أَوَ مَن كَانَ مَيۡتٗا فَأَحۡيَيۡنَٰهُ وَجَعَلۡنَا لَهُۥ نُورٗا يَمۡشِي بِهِۦ فِي ٱلنَّاسِ كَمَن مَّثَلُهُۥ فِي ٱلظُّلُمَٰتِ لَيۡسَ بِخَارِجٖ مِّنۡهَاۚ ﴾ [الانعام: ١٢٢]
‘যে ছিল মৃত, অতঃপর আমি তাকে জীবন দিয়েছি এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছি আলো, যার মাধ্যমে সে মানুষের মধ্যে চলে, সে কি তার মত যে ঘোর অন্ধকারে রয়েছে, যেখান থেকে সে বের হতে পারে না?’ {সূরা আল-‘আনআম, আয়াত: ১২২}
পক্ষান্তরে ইলমকে বুদ্ধিমান লোকদের অন্তর্দৃষ্টিতা এবং প্রাণসঞ্জীবিনী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যে ইলম দ্বারা মৃতের জীবন সঞ্চার হয় এবং মানুষের মধ্যে চলাফেরা করতে পারে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইলম রাখে না সে অন্ধকারে চলমান ব্যক্তির মতো, যে কখনই ওই অন্ধকার থেকে নিস্তার পায় না।
বাহ্যিকদৃষ্টিতে মানুষ একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা করেই থাকে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা এখানে একটি বিষয়ের প্রতি বান্দাকে আকৃষ্ট করেছেন যে, মানুষের সঙ্গে চলাফেরা এবং সামাজিকতা রক্ষা করার জন্য ইলম চাই। কুরআনী ইলম ছাড়া যত বড় শিক্ষা ও শিক্ষাবিদ থাকুক না কেন, কুরআন-হাদীছ ও ইসলামের পরিভাষায় তা মূর্খতা বৈ কিছু নয়। ইলম ও আখেরাতবিহীন জ্ঞান ও জ্ঞানের অধিকারীদেরকে আল্লাহ তা‘আলা চতুষ্পদ জন্তু কিংবা তার চেয়েও নিকৃষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং স্বয়ং মহান আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মূর্খতার উপাধি পাওয়ার পর এদেরকে জ্ঞানী হিসেবে জাহির করা কতটুকু সঠিক?
কুরআনের এক আয়াতে যাদের কুরআনের জ্ঞান নেই তাদেরকে যাদের কুরআনের জ্ঞান আছে তাদের সঙ্গে তুলনা করতে বারণ করা হয়েছে এবং তারা পরস্পরে মর্যাদার দিক দিয়ে কখনই এক নয় বলে অভিহিত করা হয়েছে। যথা-
﴿ ۞أَفَمَن يَعۡلَمُ أَنَّمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ مِن رَّبِّكَ ٱلۡحَقُّ كَمَنۡ هُوَ أَعۡمَىٰٓۚ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ١٩ ﴾ [الرعد: ١٩]
‘যে ব্যক্তি জানে তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা সত্য, সে কি তার মত, যে অন্ধ? বুদ্ধিমানরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।’ {সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৯}
সুতরাং যারা পার্থিব জীবনের জ্ঞান ও ধন-সম্পদ নিয়ে অহমিকা করে তাদের বাহ্যিক সুখদর্শনে কারো বিভ্রান্ত ও বিচলিত হওয়া উচিত নয়। ওরা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো, যারা চারণভূমিতে পেটে যতদূর জায়গা হয় ততদূর খেয়ে থাকে। আর বাড়িতে যাওয়ার পর জায়গা হয় নোংরা গোয়াল ঘর কিংবা নিকৃষ্ট খোয়াড়ে। কিন্তু একজন মানুষ কি তাই? সে কি গরুর প্রচুর খাওয়া দেখে হিংসা বা ঈর্ষা করতে পারে? না মানায় তা?
অতএব মর্যাদা, গৌরব, অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের কিছু থাকলে তা ইলমের মধ্যেই নিহিত এবং যারা ইলম ধারণ করেছে তারা বাহ্যিকদৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল, গরীব ও অসহায় মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই সফল, বিত্তবান এবং মর্যাদার অধিকারী।

ইলমের ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী

মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের জাগতিক সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। দুনিয়ার যাবতীয় আসবাব-সম্পদ মৃতের জন্য অর্থহীন ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়ে যায়। এমনকি জীবদ্দশার কৃত যাবতীয় ইবাদতের ছাওয়াবও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ইলম এমন এক ইবাদত, যার ধারাবাহিকতা কখনও শেষ হয় না। যেমন:
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মানুষ যখন মারা যায় তখন তিনটি আমল ছাড়া তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। আমল তিনটি হচ্ছে চলমান সাদাকা, এমন ইলম, যা দ্বারা (অন্যরা) উপকৃত হয় তথা ইলমে নাফে‘ এবং নেক সন্তান, যে মৃতের জন্য দু‘আ করে।’ [মুসলিম: ১৬৩১]
একজন আলেমের প্রচার-প্রসারকৃত ইলম কেয়ামত পর্যন্ত তার আমলনামায় যুক্ত হওয়ার কথা অন্য হাদীছে প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَشَرَهُ، وَوَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ، وَمُصْحَفًا وَرَّثَهُ، أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ، أَوْ بَيْتًا لِابْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ، أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ، أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ، يَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ»
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মৃত্যুর পর মুমিনের সঙ্গে যেসব আমল যুক্ত হবে সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে ইলম, যা সে অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং যার প্রচার-প্রসার করেছে; পুণ্যবান সন্তান যে সে রেখে গিয়েছে; কুরআন যার সে উত্তরাধিকারী বানিয়েছে; মসজিদ যা সে বানিয়েছে; মুসাফিরদের আশ্রয়কেন্দ্র যা সে নির্মাণ করেছে; নদী যা সে খনন করেছে এবং সাদাকা যে সে নিজ জীবদ্দশায় ও সুস্থতাকালে আপন সম্পদ থেকে দান করেছে- এসব তার মৃত্যুর পর তার সঙ্গে যুক্ত হবে।’ [ইবন মাজাহ্‌: ২৪২; সহীহ ইবন খুযাইমা: ২৪৯০, শায়খ আলবানী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন]
ইলমের পথকে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান, দামি ও জান্নাতের পথ বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: « وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ »
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (দীর্ঘ হাদীছের অংশ) ‘যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের পথ অবলম্বন করে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ [মুসলিম: ২৬৯৯]
কুরআন ও ইলমের মজলিসকে আল্লাহ তা‘আলার রহমত অবতীর্ণ হওয়ার কেন্দ্র বলে সুষ্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। এ হাদীছেরই পরের অংশে বর্ণিত হয়েছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِى بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
‘আল্লাহর যে ঘরে মানুষ একত্রিত হয় এবং তাঁর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরে ইলমের দরসে লিপ্ত হয় সেই ঘরে রহমত অবতীর্ণ হয়, ফেরেশতারা সেই ঘরকে বেষ্টন করে নেন এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আশেপাশে যারা আছেন (ফেরেশতারা) তাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন। [মুসলিম: ২৬৯৯]
পৃথিবীর এমন কে আছে, যাদের পায়ের নিচে ফেরেশতাদের মতো মহাসম্মানিত ও নিষ্পাপ মাখলুক নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন? হ্যাঁ, মহাসম্মানিত এই বান্দাগণ একমাত্র ইলমের বাহক ওলামায়ে কেরাম এবং তালেবে ইলমের পায়ের নিচে নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন। শুধু কি তাই? দিগন্তবিস্তৃত প্রাণীকুল, আসমানের ফেরেশতা, সমুদ্রের মাছ, গর্তের পিপিলিকা, ভূপৃষ্ঠে চলমান প্রতিটি প্রাণীই আলেম এবং তালেবে ইলমের জন্য মাগফিরাতের দু‘আ করতে থাকে! এই বিরল সম্মান কীসের ফসল? ইলমের ফসল। যেমন:
عَنْ كَثِيرِ بْنِ قَيْسٍ، قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا عِنْدَ أَبِي الدَّرْدَاءِ فِي مَسْجِدِ دِمَشْقَ، فَأَتَاهُ رَجُلٌ، فَقَالَ: يَا أَبَا الدَّرْدَاءِ، أَتَيْتُكَ مِنَ الْمَدِينَةِ، مَدِينَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؛ لِحَدِيثٍ بَلَغَنِي أَنَّكَ تُحَدِّثُ بِهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ: فَمَا جَاءَ بِكَ تِجَارَةٌ؟ قَالَ: لَا، قَالَ: وَلَا جَاءَ بِكَ غَيْرُهُ؟ قَالَ: لَا، قَالَ: فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ، وَإِنَّ طَالِبَ الْعِلْمِ يَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، حَتَّى الْحِيتَانِ فِي الْمَاءِ »
‘কাছীর ইবন কায়স থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দামেশকের মসজিদে আমি আবূদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কাছে বসা ছিলাম। তাঁর কাছে জনৈক ব্যক্তি আগমন করে বললেন, হে আবূদ্দারদা! আমি মদীনা শহর থেকে আপনার কাছে এসেছি একথা জেনে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শোনা একটি হাদীছ বর্ণনা করে থাকেন। আমি অন্য কোনো প্রয়োজনে আসিনি, কেবল সেই হাদীছটি শ্রবণ করতে এসেছি। আবূদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, তুমি ব্যবসায়ীক বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আগমন করনি? একমাত্র একারণেই তুমি সফর করে এসেছ? লোকটি বললেন, হ্যাঁ। একমাত্র একারণেই এখানে এসেছি। তখন তিনি বললেন, তবে শুনে রেখো, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘