শরয়ী ইলম সংক্রান্ত কিছু জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয়


আল্লাহ্‌র দিকে দাওয়াত

আল্লাহ্‌র দিকে দাওয়াত দেওয়া সর্বাধিক মহান, নৈকট্য অর্জনকারী বিষয়। এজন্যই এই কাজটি সম্পাদন করেছেন সৃষ্টির সেরা ব্যক্তিত্ব-তথা নবী-রাসূলগণ। আর ইহাই এই দাওয়াতের ফযীলতের প্রমাণ হিসাবে যথেষ্ট। কারণ আমরা সমগ্র মানুষকে জীবনের প্রকৃত দায়িত্বের দিকে আহ্বান করছি। আর তাহল যথাযথভাবে আল্লাহ তা’আলার দাসত্ব করা। মহান আল্লাহ এরশাদ করছেনঃ
(وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْأِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ)[الذاريات:৫৬]
আমি জিন ও মানবজাতীকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করার জন্যে। (আয্‌ যারিয়াতঃ৫৬)।
এজন্যই আল্লাহ এর বিনিময় স্বরূপ সুনির্দিষ্ট করেছেন মহান বিনিময়, অফুরন্ত প্রতিদান। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
(لَأَنْ يَهْدِىَ اللهُ بِِكَ رَجُلاً وَاحِداً خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ) [رواه البخاري -كتاب المغازي৪২১০، ومسلم ুفضائل الصحابة ২৪০৬]
আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকেও হেদায়াত দান করেন, তবে ইহাই তোমার জন্য লাল উট অপেক্ষা উত্তম (বুখারী,মাগাযী অধ্যায়,হা/৪২১০,মুসলিম,ফাযায়েলুছ্‌ ছাহাবাহ্‌ অধ্যায়,হা/২৪০৬)।
এই মহান পুরষ্কার এজন্যই যে, এই কাজটি অতীব গুরূত্বপূর্ণ। এজন্যই প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত হল আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার মৌলিক নীতি জেনে নেওয়া এবং এবং এই উম্মতের পূর্বসূরীদের তরীক্বার অনুসরণ করা যাদের প্রধান হলেন ইসলামের প্রথম দাঈ মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِداً وَمُبَشِّراً وَنَذِيراً (৪৫) وَدَاعِياً إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجاً مُنِيراً (৪৬))[الأحزاب]
হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষীদাতা, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে, এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও প্রদীপ্ত প্রদীপ হিসাবে প্রেরণ করেছি। (আল্‌ আহ্‌যাব : ৪৫-৪৬)।
কারণ নবী ও তাঁর অনুসারীদের আল্লাহর পথে দাওয়াত ছিল জাগ্রত জ্ঞান সহকারে। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (১০৮)[ يوسف]
‘(হে রাসূল!) আপনি বলে দিন ইহাই আমার পথ আমি ও আমার অনুসারীগণ আল্লাহর পথে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে দাওয়াত দান করি। আমি আল্লাহ্‌র পবিত্রতা বর্ণনা করছি। এবং আমি মুশরিকদের দলভুক্ত নই। (ইউসুফঃ১০৮)।

আমরা আল্লাহ্‌র দিকে দাওয়াত দিব নিম্ন বর্ণিত কারণে:
১-আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসার এবং যমীনের বুকে তাঁর দাসত্ব বাস্তবায়ন করা
আর ইহা সম্পন্ন হবে উহার বিপরীত বিষয়গুলির অবসানের মাধ্যমে যেমন বিভিন্ন রকম কুফরী, সীমালংঘন, পাপাচার ও অবাধ্যতা প্রভৃতি।
২-উত্তম নমুনা তথা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করা
কারণ তিনি রাত ও দিনের বিভিন্ন অংশে দাওয়াত দিতেন। তিনি আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছেন যেমন করে ছিলেন তাঁর পূর্বেকার নবী ও রাসূলগণ। মহান আল্লাহ্‌ নূহ আলাইহিস্‌ সালাম এর বক্তব্য উল্লেখ করে বলেনঃ
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلاً وَنَهَاراً (৫) فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائي إِلَّا فِرَاراً (৬) وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَاراً (৭) ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَاراً (৮) ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَاراً (৯)[نوح]
‘সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার জাতিকে রাতে এবং দিনে আহ্বান করেছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নই বৃদ্ধি করেছে মাত্র। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, ততবারই তারা কানে আঙ্গুলি দিয়েছে, মুখমন্ডল বস্ত্রাবৃত করেছে, জেদ করেছে এবং খুব ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়েছি। অতঃপর আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি। ( সূরা নূহ : ৫-৯)
নবী নূহ আলাইহিস্‌ সালাম অন্যান্য নবীগণের ন্যায় একজন নবী। তিনি তাঁর কওমকে সর্বসময়, সর্ব উপকরণ, পথ ও পদ্ধতি অবলম্বনে দাওয়াত দিয়েছেন। বরং তিনি বিনা বিরক্তি বিনা অবসাদে সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শ’ বছর দাওয়াত দিয়েছেন। এজন্যই আমাদের বন্ধু নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিম্নোক্ত ডাকে সাড়া দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে-
(ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ)[ النحل:১২৫].
‘আপানি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বন করুন।’ ( সূরা আন নাহল:১২৫)।
(وَادْعُ إِلَى رَبِّكَ إِنَّكَ لَعَلَى هُدىً مُسْتَقِيمٍ) [الحج:৬৭]
‘আর আপনি আপনার রবের দিকে আহ্বান করুন। নিশ্চয় আমি সঠিক হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন।’ (সূরা আল হজ : ৬৭)
(وَادْعُ إِلَى رَبِّكَ وَلا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ) [القصص:৮৭]
‘আর আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করুন। আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকুন।’ (সূরা আল্‌ ক্বাছাছ : ৮৭)
তাইতো নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মৃত্যুদম পর্যন্ত আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী হিসাবে কাটিয়েছেন। তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেনঃ
(بَلِّغُوْا عَنِّيْ وَلَوْ آيةً)[ البخاري، كتاب الأنبياء، باب ما ذكر عن بني إسرائيل، حديث ৩৪৬১]
‘তোমরা আমার নিকট থেকে পৌঁছিয়ে দাও-তথা প্রচার কর, যদিও তা একটি আয়াতও হয়।’ (বুখারী, হা/৩৪৬১)।
৩-যদি আল্লাহর পথে দাওয়াত অব্যাহত না থাকে তবে কুফর ও শিরকের উপস্থিতি দ্রুত হোক বা বিলম্বে, এক সময় তা ইসলামের স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলবে এবং তার অনুসারীদেরকে হ্রাস করবে।
৪-মুসলিমদের থেকে ধ্বংস ও শাস্তি প্রতিহত করা:
মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(وَاتَّقُوا فِتْنَةً لا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ) [الأنفال:২৫]
আর তোমরা এমন ফিৎনাহকে ভয় কর যা তোমাদের মধ্যেকার অত্যাচারীদেরকেই শুধু আপতিত করবে না। (বরং সকলকে তা গ্রাস করবে)। আর জেনে রেখ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ হলেন কঠিন শাস্তিদানকারী। (সূরা আল্‌ আনফাল: ২৫)।
যায়নাব বিনতে জাহ্‌শ থেকে বর্ণিত,তিনি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ আমরা কি আমাদের মাঝে সৎকর্মশীলদের উপস্থিতি সত্ত্বেও ধ্বংস প্রাপ্ত হব? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ অবশ্যই। যখন পাপাচার বৃদ্ধি পাবে। (মুসলিম,ফিৎনা-ফাসাদ অধ্যায়, হা/২৮৮০)।
৫-ইসলামের প্রতি মানুষের অতীব প্রয়োজনীয়তা
কারণ তাদেরকে গায়রুল্লাহর গোলামী ও দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রয়োজন। এবং তাঁর জটীল সমস্যা গুলির সমাধান ও তার অবস্থার সংশোধন প্রয়োজন। আর এসব সমস্যার সমাধান একমাত্র বিশুদ্ধ ইসলাম দ্বারাই সম্ভব। আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكاً)[طـه:১২৪]
‘যে আমার যিক্‌র-উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্য অবশ্যই রয়েছে সংকীর্ণময় জীবন।’ (সূরা ত্বা-হা : ১২৪)।
৬-খৃষ্টানী ও ভ্রষ্টতার দাওয়াতের অপতৎপরাতার মুখে দাঁড়ানো যা সমগ্র পৃথিবীকে ধ্বংস করেছে এবং কতিপয় দুর্বলদের মনে নিজ ইসলাম ধর্ম বিষয়ে সংশয়ের ধুম্রজালে আবদ্ধ করে দিয়েছে।
৭-ধ্বংসকারী কতিপয় দর্শন যেমন ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, ধর্মহীনতা, জাতীয়তাবাদ, ধর্মহীন আধুনিকতা প্রভৃতির প্রসারতা রোধ করা।
৮-নিশ্চয় আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান করা সর্বাধিক সম্মানিত দায়িত্ব। কারণ এরই মাঝে দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান নিহিত রয়েছে।

আল্লাহ্‌র পথে দাওয়াত দেওয়ার বিধান কি? কার উপর এই দায়িত্ব বর্তায়?

আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর নিজ নিজ সাধ্যানুযায়ী ওয়াজিব। কারণ মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ)[آل عمران:১০৪]
‘তোমাদের মাঝে এমন একটি দল হওয়া উচিত। যারা কল্যাণের পথে আহ্বান করবে, আর ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করবে।’ (সূরা আলে ইমরানঃ১০৪)
মহান আল্লাহ্‌ আরো বলেন:
(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ)[آل عمران:১১০]
‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষের কল্যণের জন্য। তোমরা ন্যায়ের আদেশ করবে এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।’ (আলে ইমরানঃ ১১০)।
তা ছাড়াও নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
(مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ)[مسلم].
তোমাদের কেউ কোন গর্হিত কাজ দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তা না পারে, তবে মুখ দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তাও না পারে তবে অন্তর দিয়ে প্রতিহত করবে। আর ইহা হল দুর্বলতম ঈমান। (মুসলিম,ঈমান অধ্যায়। হা/৪৯)।
উল্লেখ্য(ولتكن منكم) এর মধ্যেকার (من)টি তাবঈয তথা অংশ বিশেষ বুঝানোর জন্য এসেছে[১]। অথবা (الاستغراق) তথা ব্যাপকতা বুঝানোর জন্য এসেছে। আল্লাহর বাণীঃ
(فاجتنبوا الرجس من الأوثان واجتنبوا قول الزور) এর মধ্যে (من) এর মতই এর ব্যবহার যা ব্যাপকতা বুঝানোর জন্য এসেছে। এজন্যই অত্র আয়াত দ্বারা নির্দিষ্ট কোন জামা’আতের সাথে দাওয়াতের বিষয়টি খাছ করা যাবে না। বরং তা সকলের উপরই ওয়াজিব। বিষয়টির প্রমাণ স্বরূপ পূর্বের দলীলগুলো এবং প্রাগুক্ত আয়ত (ولتكن منكم) এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যথেষ্ট।

কতিপয় বিষয় যা দাওয়াত দাতার উপর লক্ষ্য রাখা ওয়াজিবঃ

১-ইলমঃ দাঈর উপর ওয়াজিব হল তিনি যার দিকে মানুষকে আহ্বান করবেন, সে বিষয়টি ও সম্পর্কে জ্ঞান সম্পন্ন হবেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ)
‘আপনি বলে দিন,ইহাই আমার পথ আমি আল্লাহর পথে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে দাওয়াত দিয়ে থাকি।’ (সূরা ইউসুফঃ১০৮)।
আর ইলম মূলতঃ একটি মাত্র বস্তু নয় যা বিভাজন, বিভক্তি কবুল করে না। বরং এর অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন মাসআলাহ্‌ জানলো সে উক্ত মাসআলার আলেম। এজন্য তার উপর ওয়াজিব হল সেদিকে মানুষকে আহ্বান করা। অবশ্য তাকে যে বিষয়ের ইলম নেই সেই বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্বভার দেওয়া হয়নি।
প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির ওয়াজিব হল সে তার জ্ঞান অনুযায়ী দাওয়াত দেবে। আর যে বিষয়ে তার জানা নেই সে বিষয়ে অযথা দায়িত্বভার নিতে যাবে না। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ) (৮৬) [سورة ص ].
‘বল, আমি তোমাদের নিকট এই দাওয়াতের উপর কোন বিনিময় চাইনা, এবং আমি লৌকিকতা প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ (সূরা ছাদ : ৮৬)
আর যদি আমরা দাওয়াতকে শুধু মাত্র বিজ্ঞ আলেমদের মাঝেই সীমিত করে দেই, আর অন্যদের জন্য এ দাওয়াত নাজায়েয বলি, তাহলে আমাদের নিকট অতি অল্প সংখ্যক দাঈ টিকবে যা উল্লেখযোগ্য নয়। তখন বতিল ও গর্হিত কাজ প্রচার ও প্রসারতা লাভ করবে।
অনুরূপভাবে দাঈদের কর্তব্য হল উলামায়ে দ্বীন থেকে উপকৃত হওয়া। তাদের মতামত, বই-পুস্তক প্রভৃতি থেকে আলো গ্রহণ করা।

২-দাঈর উপর ওয়াজিব হল সর্ব সময় সর্বাবস্থায় দাওয়াত করা:
আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়া, ছালাত, ছিয়াম ও হজ প্রভৃতির মত নিদির্ষ্ট সময়-কালের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। যা থেকে আগে-পিছে করা যাবে না, এমন নয়[২]।
নূহ্‌ আলাইহিস্‌ সালাম তাঁর জাতীকে রাতে, দিনে, প্রকাশ্যে, অপ্রকাশে সর্বাবস্থায় দাওয়াত দিয়েছেন। অনুরূপভাবে ইউসুফ আলাইহিস্‌ সালাম জেল খানাকে দাওয়াতের ক্ষেত্র ভূমিতে পরিবর্তিত করে দিয়ে ছিলেন। জেলে থাকার বিষয়টিকে তিনি দাওয়াতী কর্ম থেকে বিরত থাকার ওযর হিসাবে পেশ করেননি।
অতএব, একজন মুসলিম সে নিজ ঘরে, কর্মস্থলে, বাজারে, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে, নিজ আচার আচরণে, মানুষের সাথে লেন-দেন করার ক্ষেত্রে, সফরে, মুকীম অবস্থায় তথা প্রত্যেকটি অবস্থায় ও প্রতিটি মুহূর্তে দাওয়াতদানকারী হিসাবে ভূমিকা পালন করবে। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(قُلْ إِنَّ صَلاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)[الأنعام:১৬২]
‘নিশ্চয় আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও মরণ সবই আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনের জন্য নিবেদিত।’ (সূরা আল্‌ আন’আম : ১৬২)।
নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘তুমি যেখানেই থাকনা কেন, আল্লাহ্‌-কে ভয় করবে। (তিরমিযী, কিতাবুল বির ওয়াছ্‌ ছিলাহ্‌,হা/১৯৮৭)।

৩-এটা শর্ত নয় যে দাঈর কথা মানুষ মেনে নেবে
মহান আল্লাহ্‌ বলেন:
(وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلاغُ الْمُبِينُ)[النور:৫৪،العنكبوت:১৮]
‘রাসূলের উপর স্পষ্টভাবে পৌঁছানো ছাড়া আর কোন দায়িত্ব নেই।’ (সূরা আল্‌ আনকাবূতঃ১৮)
একজন দাওয়াত-কর্মীর কর্তব্য হল, সে নিজ দাওয়াতী কর্মে নিয়োজিত থাকবে। যদিও তার কথা কেউ না মানে, না শুনে। কারণ, মূল উদ্দেশ্য হল প্রকাশ্যভাবে পৌঁছিয়ে দেওয়া। দাওয়াতকৃত ব্যক্তিদের সাড়া দেওয়া দাঈর জন্য আবশ্যক নয়। অতএব তার উচিত নিজ ওয়াজিব দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে বিরক্তি বোধ, ক্লান্তি, অবসাদ কিছুই যেন তাকে না পায়। নিজ দাওয়াতী কাজ নিয়মিত আদায় করা অন্যান্য ইবাদতগুলি নিয়মিত আদায় করার মত। ইহাই আল্লাহ্‌র নবী ও রাসূলগনের আদর্শ।
যেমন নূহ আলাইহিস্‌ সালাম নিজ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে নিকট সাড়ে নয়শ’ বছর পর্যন্ত দাওয়াত দিতে থেকেছেন অথচ তাঁর আহবানে অল্প কিছু লোকই ঈমান এনেছিল। বরং কোন কোন নবী যুগের পর যুগ নিজ সম্প্রদায়ের লোকদেরকে দাওয়াত দিতে থেকেছেন এরপরও তাঁদের দাওয়াতে একজনও ঈমান আনেনি। ইমাম নববী (রহ.) ছহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলেনঃ শরীয়ত বলবৎ হয়েছে এরূপ ব্যক্তি থেকে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করার দায়িত্ব রহিত হবে না। এই ধারনা করা যাবে না যে তার এই আদেশ নিষেধ কোন উপকারে আসবে না। বরং এরপরও আদেশ নিষেধ করা তার জন্য ওয়াজিব। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِينَ)[الذاريات:৫৫]
‘আপনি উপদেশ দিন, কারণ ওয়ায-উপদেশ মুমিনদের উপকার দেয়। ‘ ( সূরা আয্‌ যারিয়াত: ৫৫)। কারণ তার উপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে তাহল এই যে, সে তার দাওয়াতী কাজ বিরতিহীনভাবে চালিয়ে যাবে। আদেশ ও নিষেধ কবুল করানো তার দায়িত্ব নয়। (ছহীহ মুসলিম ইমাম নববীর ব্যাখ্যাসহ)।
মহান আল্লাহ বলেনঃ
(وَإِذْ قَالَتْ أُمَّةٌ مِنْهُمْ لِمَ تَعِظُونَ قَوْماً اللَّهُ مُهْلِكُهُمْ أَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَاباً شَدِيداً قَالُوا مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ)[الأعراف:১৬৪]
তাদের মধ্য থেকে কিছু লোক বলল, কেন তোমরা এমন লোকদেরকে উপদেশ দিচ্ছ, যাদেরকে আল্লাহ্‌ ধ্বংস করবেন বা কঠিন শাস্তি দেবেন? তারা জবাবে বলল, এটা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট দায়মুক্তি স্বরূপ। আর হতে পারে তারা আল্লাহকে ভয় করবে। (সূরা আল্‌ আরাফঃ১৬৪)।
দাওয়াতী কর্ম চালিয়ে যাওয়ার পিছনে ইহাই হল মূল কারণ, যদিও কোন প্রতিফল দেখা না যায়। কারণ অন্তরসমূহ তো রহমান-দয়াময় আল্লাহর দুটি আঙ্গুলের মধ্যে রয়েছে। তিনি যেভাবে চান তা পরিবর্তন করেন। সুতরাং আজ যে দাওয়াতে প্রভাবিত হয়নি, হতে পারে আগামীকাল সে দাওয়াতে প্রভাবিত হবে। এই তো সেই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, আবু সুফয়ান ইবনু হারব এবং হিন্দাহ বিনতে ওতবাহ যাঁরা রাসূল(ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে তারাই তাঁর ধর্মের পথে দাওয়াতদানকারী বনে গিয়ে ছিলো। যদি দাওয়াতী কাজ তাদের থেকে মওকূফ রাখা হত আর তাদের কে পূর্ব পৌঁছনো দাওয়াতের কারণে আর দাওয়াত না দেওয়া হত তাহলে তাদের শেষ পরিণতি বড্ড খারাপ হত।

৪-দাওয়াত দানকৃত ব্যক্তির উপর দয়া-মায়া প্রদর্শনঃ
নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কল্যাণের বিষয়ে ন্যায়ের আদেশ, অন্যায় থেকে নিষেধ, আল্লাহর পথে জিহাদ, তাঁর পথে দাওয়াত দেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত লালায়িত ছিলেন। ইহা সত্ত্বেও তিনি তাঁর উম্মতের উপর সর্বাধিক দয়া-মায়া প্রদর্শন কারী ছিলেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَحِيمٌ)[التوبة:১২৮]
নিশ্চয় তোমাদের নিকট তোমাদেরই মধ্য থেকেই এসেছেন একজন রাসূল। তোমাদের কষ্টদানকারীবস্তু তাকেও কষ্ট দেয়। তিনি তোমাদের (কল্যাণ দান করার) জন্য লালায়িত, মুমিনদের জন্য করূণাকারী ও দয়ালু। (সূরা আত্‌ তাওবাহ:১২৮)
বরং তিনি তাঁর উম্মতের ক্ষেত্রে কিরূপ কল্যাণ পৌঁছানোর জন্য লালায়িত তা তিনি নিজেই চিত্রায়িত করে বলেনঃ
(إِنَّمَا مَثَلِى وَمَثَلُ أُمَّتِى كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا فَجَعَلَتِ الدَّوَابُّ وَالْفَرَاشُ يَقَعْنَ فِيهِ فَأَنَا آخِذٌ بِحُجَزِكُمْ وَأَنْتُمْ تَقَحَّمُونَ فِيهِ)[رواه مسلم كتاب الفضائل، باب شفقته صلى الله عليه وسلم على أمته…رقم الحديث ১৭].
আমার উদাহরণ ও আমার উম্মতের উদাহরণ হল ঐব্যক্তির ন্যায় যে আগুন প্রজ্জলিত করল, তা দেখে কীট-পতঙ্গ তাতে পড়তে শুরূ করে দিল। সুতরাং আমি তোমাদের কোমর ধারণকারী (যাতে আগুনে না পতিত হও) অথচ তোমরা তাতেই পতিত হচ্ছ। (সহীহ মুসলিম,ফাযায়েল অধ্যায়,হা/১৭)।
অতএব একজন দাঈর উচিত দাওয়াতের পিছনে প্রকৃত উদ্বুদ্ধকারী বিষয় যেন হয় পাপাচারীদের উপর মন্দ পরিণতির ভয় করা। এজন্যই তো নূহ্‌ আলাইহিস্‌ সালাম তাঁর দাওয়াতের অন্যতম কারণ হিসাবে প্রকাশ করেছেন নিজ কওমের উপর তার ভয়-ভীতি। মহান আল্লাহ্‌ তাঁর কথা উদ্ধৃত করে বলেনঃ
(إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ)[الأعراف:৫৯]
‘নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর এক মহান দিনের আযাবের ভয় করছি।’ (সূরা আল্‌ আরাফ : ৫৯)
আর এই তো সেই ফিরআউন বংশের মুমিন ব্যক্তিটি যিনি তার কওমকে লক্ষ্য করে বলেনঃ
(يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ)[غافر:৩০].
‘হে আমার জাতি! নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর পূর্ববতী সম্প্রদায়সমূহের মতই বিপদ সঙ্কুল দিনের আশংকা করছি।’ (সূরা আল গাফির-মুমিন : ৩০)।
তিনি আরও বলেনঃ
(وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ)[غافر:৩২]
‘হে আমার জাতি! আমি তোমাদের জন্যে প্রচন্ড হাঁক-ডাকের দিনের তথা মহাপ্রলয় দিবসের আশংকা করছি।’ (সূরা আল গাফের-মুমিন : ৩২)।
দাঈর কর্তব্য হল তিনি মনে করবেন যে, তিনি রোগীদের সাথে লেন-দেন করছেন। আর রোগীরা এমন হৃদয়ের মুখাপেক্ষী যা হয় দয়ালু ও রহমকারী। সুতরাং তারা রূহানী রোগীদের সাথে ঐরূপ আচরণ করবেন যেরূপ আচরণ করে থাকেন ডাক্তারগণ বাহ্যিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের সাথে। অধিকাংশ পাপাচারীই উপলদ্ধি করতে পারে না ঐসব পাপের ভয়াবহতা যাতে তারা লিপ্ত। কাজেই দাওয়াত-কর্মীদের কর্তব্য হল ঐসব পাপাচারীদের ভুল সংশোধনকালীন নরমতা, হিকমত, ধির-স্থিরতা অবলম্বন করা। ইহাই হল মূলতঃ আল্লাহভীরু ওলামায়ে দ্বীনের আদর্শ পদ্ধতি। এজন্যই মহান আল্লাহ্‌ তাঁর নবী মূসা ও হারূনকে নির্দেশ করে ছিলেন সহজ ও নরম কথা ব্যবহার করার, তাও আবার এমন ব্যক্তির সাথে যে হল এই যমীনের উপর সর্বাধিক বড় ত্বাগুত। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(فَقُولا لَهُ قَوْلاً لَيِّناً)[طـه:৪৪]
‘তোমরা তাকে নরম কথা বল।’ ( সূরা ত্বা-হা : ৪৪)।
অতএব যদি ফিরাউন তার সীমালংঘন ঔদ্ধত্য, প্রভূ হওয়ার দাবী করা, এবং মানুষকে নিজের ইবাদত করার দিকে আহ্বান করা সত্ত্বেও যদি তার সাথে নরম ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হয়, তাহলে তো সে ব্যতীত অন্যান্য ফাসেক ও পাপাচারী এ বিষয়ে আরোও বেশী হকদার। অবশ্য এসব কথা থেকে যেন কোন ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাড়াহুড়া প্রিয় ব্যক্তি একথা বুঝে না নেয় যে, এরূপ আচরণ পাপাচারী-অপরাধকারীদের সাথে শিথিলতা করা বুঝায়। বরং ইহাই প্রকৃত হিকমত।
আর দ্বীনের ব্যাপারে শিথিলতা হল, পাপাচারী ব্যক্তিদের ভুল-ভ্রান্তি থেকে চোখ বন্ধ করে রাখা, তাদেরকে ওয়ায-উপদেশ, সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দেওয়া থেকে বিরত থাকা, আর এর উদ্দেশ্য হবে ঐসব পাপাচারী ব্যক্তির থেকে দুনিয়াবী কোন সুবিধা অর্জন করা।
দাঈর উচিত হল যে সে রূঢ়তা, কঠোরতা থেকে দূরে থাকবে এবং তাদের ভুল সংশোধন করার সময় রেগে যাওয়া থেকে দূরে থাকবে। এই বিশ্বাসে তাদের উপর রেগে যাবে না যে আল্লাহ ও রাসূলের উদ্দেশ্যেই তার এই ক্রোধ। বস্তুত যারই এসব চিন্তা-ধারা হবে সেই সঠিক পথ থেকে বহু দূরে অবস্থান করবে। তাড়াতাড়ি ফল পেতে চেয়ে সে সুফল থেকে সে বঞ্চিত হবে। মহান আল্লাহ্‌ -তাঁর নবী মুহাম্মাদ-ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে এরশাদ করেনঃ
(وَلَوْ كُنْتَ فَظّاً غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ)[آل عمران:১৫৯]
‘যদি আপনি কঠোর ও রূঢ় হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চতুর্পাশ থেকে ভেগে যেত।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)।
তবে আল্লাহর দিনের জন্য রাগ করা ও বদলা গ্রহণ করা অবশ্যই বৈধ। তবে এটি হবে দাওয়াত কৃত ব্যক্তির স্তরের উপর নির্ভরশীল। কাজেই একজন কাফের ও ফাসেকের সাথে যেরূপ আচরণ করা হয় তদ্রূপ আচরণ একজন মুসলিমের সাথে হবে না যে মুসলিম ব্যক্তিটি ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত যার ক্ষেত্রে আমরা ভেগে যাওয়ার আশংকা করি না। এবং আমরা যার অন্তরে ঈমান কিরূপ প্রবেশ করেছে মর্মে জানি। এক কথায় প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে তার অবস্থাভেদে আচরণ করতে হবে।
অনুরূপভাবে দাঈর উচিত পাপাচারীদের ভুল সংশোধন করতে গিয়ে ইশারাহ্‌ ইঙ্গিত ব্যবহার করা। অতএব তিনি তাদের বিষয়টি প্রকাশ করে দেবেন না, তাদেরকে জনসমুদ্রে অপমান করবেন না। বরং তাঁর উচিত এইভাবে বলাঃ ‘লোকদের কি হয়েছে তারা এরূপ এরূপ করছে? এই পদ্ধতির মাধ্যমেই তিনি উদ্দেশ্যকৃত খাছ ব্যক্তিদেরকে সতর্ক করে দিলেন, জাহেলদেরকে শিক্ষা দিলেন। এভাবে তার উদ্দেশ্য হাছিল হয়ে গেল অথচ ভুলকারীর কোন অসুবিধা হল না। এটা মূলতঃ আল্লাহর নবী-রাসূল আলাইহিমুস্‌ সালামদের কর্ম- পদ্ধতি। অতএব (হে দাঈ!) আপনি এই পদ্ধতি থেকে আঙ্গুলের পৌর বরাবরও দূরে সরবেন না। আপনাকে যেন এমন ব্যক্তি ধোঁকায় না ফেলে দেয় যে এই নববী তরীকার বিরোধিতা করে বা তা থেকে পথচ্যূত হয়েছে।

৫-দাওয়াতদাতা মানুষদের নিকট দাওয়াতের কোন বিনিময় তালাশ করবেন না, তাদের প্রশংসা, তাদের তরফ থেকে মর্যাদা আশা করবেন না।
বস্তুত দাওয়াত হল অন্যান্য ইবাদতের মত একটি মহান ইবাদত যা থেকে একমাত্র খাঁটি ইবাদতটিই গ্রহণ করা হবে। আর এই ইবাদতের উপর একমাত্র মুখলিছ ব্যক্তিকেই নেকী দান করা হবে। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لا يُبْخَسُونَ)[هود:১৫]
‘যে ব্যক্তি এই পার্থিব্য জীবন ও তার চাক-চিক্যতা চাইবে আমি তাদেরকে এই দুনিয়াতেই তাদের আমলের বিনিময় পুরাপুরিভাবে প্রদান করব। এখানে তাদেরকে তা কম করে দেওয়া হবে না। (সূরা হূদঃ১৫)।
এজন্যই তো শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্‌ হাব রহ. তার মহান কিতাব-আত তাওহীদে একটি অধ্যায় এভাবে রচনা করেছেন।
‘অধ্যায়ঃ ব্যক্তির আমল দ্বারা দুনিয়া লাভের ইচ্ছা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত’
এই অধ্যায়ে তিনি মহান আল্লাহর এই আয়াতটি দলীল স্বরূপ উল্লেখ করেছেন।
(مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لا يُبْخَسُونَ (১৫) أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (১৬))[هود:১৫-১৬]
‘যে ব্যক্তি এই পার্থিব্য জীবন ও তার চাক-চিক্যতা চাইবে আমি তাদেরকে এই দুনিয়াতেই তাদের আমলের বিনিময় পুরাপুরিভাবে প্রদান করব। এখানে তাদেরকে তা কম করে দেওয়া হবে না। এরাই হল তারা যাদের জন্য আখেরাতে জাহান্নামের আগুন বৈ আর কিছুই নেই। তারা যা কিছু কর্ম করে ছিল দুনিয়াতে তা সবই বরবাদ হয়ে গেছে। তারা যা কিছু আমল করত তার সবই বাতিল বলে গণ্য। (সূরা হূদ : ১৫-১৬)।
এজন্যই দাঈর কর্তব্য হল, সে মানুষের নিকট তার দাওয়াতের কোন বিনিময় আশা করবে না। আর তার উদ্দেশ্যও দৃঢ় ইচ্ছা যেন না হয় মানুষদের প্রশংসা, তাদের পক্ষ থেকে সম্মান গ্রহণ, তাদের থেকে নিজকে আলাদা ভাবা এবং সম্মানের প্রাচীরদ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়া। যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন হবে সে তার দাওয়াতের বিনিময় থেকে বঞ্চিত হবে, আল্লাহর আযাবের হকদার হবে। কারণ সে এর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদতে শিরক করে বসেছে।
নবী ও রাসূল আলাইহিমুস্‌ সালাম গণ এই তরীকা স্পষ্ট করেই তুলে ধরেছেন। তারা মানুষদের থেকে দাওয়াতের পারিশ্রমিক হিসাবে কোন বিনিময় বা শুকরিয়া কামনা করতেন না। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ
(فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُمْ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ)[يونس:৭২]
‘যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে মনে রেখ। আমি কিন্তু তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাইনি, আমার বিনিময় তো আল্লাহর কাছেই রয়েছে।’ (সূরা ইউনুস : ৭২)
মহান আল্লাহ্‌ আরো বলেনঃ
(قُلْ لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْراً إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى وَمَنْ يَقْتَرِفْ حَسَنَةً نَزِدْ لَهُ فِيهَا حُسْناً إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ شَكُورٌ)[الشورى:২৩]
‘আপনি বলে দিন আমি আমার দাওয়াতের জন্যে তোমাদের কাছে কেবল আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ চাই। যে কেউ উত্তম কাজ করে আমি তার জন্য তাতে পুণ্য বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমাকারী, গুণগ্রাহী। (সূরা আশ্‌ শুরা : ২৩)।
মহান আল্লাহ্‌ আরো বলেনঃ
(وَجَاءَ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ رَجُلٌ يَسْعَى قَالَ يَا قَوْمِ اتَّبِعُوا الْمُرْسَلِينَ . اتَّبِعُوا مَنْ لا يَسْأَلُكُمْ أَجْراً وَهُمْ مُهْتَدُونَ)[يس:২০-২১]
‘আর শহরের দূরতম প্রান্ত থেকে জনৈক ব্যক্তি দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল : হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা এই রাসূলদের আনুগত্য কর। এমন ব্যক্তিদের আনুগত্য কর, যারা তোমাদের নিকট কোন কোন প্রকার বিনিময় চান না। উপরোন্তু তাঁরা হেদায়াত প্রাপ্ত। (সূরা ইয়া-সীন : ২০-২১)।
নিশ্চয় দাওয়াতের বিনিময়ে মানু